কৃত্রিম টার্ফে খেলা। তাই ঝুঁকি নিতে চাননি মিশরের কোচ হোসাম হাসান। দক্ষিণ সুদানের বিপক্ষে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের বাছাইপর্বের ম্যাচে দলের সবচেয়ে বড় তারকা মোহামেদ সালাহকে বিশ্রাম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মিশর। ম্যাচটি মঙ্গলবার দক্ষিণ সুদানের রাজধানী জুবায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে দলের সঙ্গে জুবায় যাননি ৩৪ বছর বয়সী সালাহ।
সালাহকে বাইরে রাখার সিদ্ধান্তটি মূলত মাঠের সারফেস বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ সুদানের বিপক্ষে ম্যাচটি হবে কৃত্রিম টার্ফে। এমন মাঠে খেলার ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের শারীরিক চাপ এবং সম্ভাব্য চোটের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। যদিও কৃত্রিম মাঠে চোটের ঝুঁকি প্রাকৃতিক ঘাসের তুলনায় বেশি—এমন নিশ্চিত প্রমাণ গবেষণায় পাওয়া যায়নি। তারপরও দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে নিয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করেছে মিশরের টেকনিক্যাল স্টাফ।
মিশর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা ইএফএ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মাঠের সারফেস বিবেচনায় দক্ষিণ সুদানের বিপক্ষে সালাহকে বিশ্রাম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জাতীয় দলের টেকনিক্যাল স্টাফ। কোচ হোসাম হাসানের নেতৃত্বে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সালাহকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ম্যাচের আগে থেকেই পরিকল্পনার অংশ ছিল।
ইএফএর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অ্যাঙ্গোলার বিপক্ষে আগের ম্যাচের আগেই সালাহর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন কোচিং স্টাফ। মাঠের ধরন এবং খেলোয়াড়ের শারীরিক বিষয় বিবেচনা করে দক্ষিণ সুদানের ম্যাচে তাকে না খেলানোর ব্যাপারে তখনই আলোচনা হয়। শেষ পর্যন্ত সালাহকে বিশ্রামে রাখার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে মিশর।
শুক্রবার অ্যাঙ্গোলার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের ম্যাচে মিশরের একাদশে ছিলেন সালাহ। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে ১৫ মিনিট পার হওয়ার পর তাকে মাঠ থেকে তুলে নেন কোচ হোসাম হাসান। ম্যাচে গোল না পেলেও সালাহর উপস্থিতি ছিল মিশরের আক্রমণভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে পরের ম্যাচে তাকে আর মাঠে নামানো হবে না—এমন সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হয়েছিল।
সালাহর জন্য বিশ্রামের এই সিদ্ধান্ত মিশরের জন্য কিছুটা চ্যালেঞ্জও তৈরি করতে পারে। কারণ জাতীয় দলের আক্রমণভাগে তিনি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। তার গোল করার ক্ষমতা, বল তৈরি করা এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করার দক্ষতা মিশরের আক্রমণভাগকে বাড়তি শক্তি দেয়। ফলে দক্ষিণ সুদানের বিপক্ষে তাকে ছাড়া খেলতে হবে দলটিকে।
তবে মিশরের টেকনিক্যাল স্টাফের কাছে সালাহকে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ রাখা গুরুত্বপূর্ণ বলেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ক্লাব ও জাতীয় দলের ব্যস্ত সূচির মধ্যে নিয়মিত ম্যাচ খেলা একজন খেলোয়াড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। কৃত্রিম টার্ফের ম্যাচে তাকে না খেলিয়ে পরবর্তী ম্যাচগুলোর জন্য প্রস্তুত রাখাই এখন মিশরের পরিকল্পনার অংশ বলে ইএফএর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
কৃত্রিম টার্ফে খেলোয়াড়দের চোটের ঝুঁকি নিয়ে ফুটবলে বহু বছর ধরে আলোচনা রয়েছে। কৃত্রিম মাঠে বলের গতি, পায়ের সঙ্গে মাঠের ঘর্ষণ এবং মাঠের কঠোরতার অনুভূতি প্রাকৃতিক ঘাসের চেয়ে কিছুটা আলাদা হতে পারে। তবে আধুনিক কৃত্রিম টার্ফের মান উন্নত হওয়ার ফলে চোটের হার নিয়ে আগের অনেক ধারণা নতুন করে মূল্যায়ন করা হয়েছে। গবেষণাতেও কৃত্রিম মাঠে খেললেই চোটের ঝুঁকি বেশি—এমন সরাসরি সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
এর মধ্যেই ক্লাব ফুটবলেও দারুণ সময় কাটাচ্ছেন সালাহ। গত মৌসুম শেষে দীর্ঘ নয় বছরের সম্পর্কের ইতি টেনে লিভারপুল ছাড়েন তিনি। ইংলিশ ক্লাবটির হয়ে ৪৪২ ম্যাচে ২৫৭ গোল করেছেন এই মিশরীয় ফরোয়ার্ড। লিভারপুলের হয়ে তার ক্যারিয়ারে এসেছে নয়টি বড় ট্রফি। ক্লাবটির জার্সিতে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত গোল করার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দলের সাফল্যেও বড় ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
লিভারপুল অধ্যায় শেষ করার পর নতুন ক্লাবে যোগ দিয়েও নিজের পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন সালাহ। চলতি মৌসুমে তুরস্কের ক্লাব ট্রাবজন্সপোরের হয়ে খেলছেন তিনি। তুর্কি সুপার লিগে এখন পর্যন্ত ছয় ম্যাচে সাত গোল করেছেন সালাহ। পাশাপাশি তার নামের পাশে রয়েছে দুটি অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ নতুন ক্লাবেও গোল ও গোল তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখছেন তিনি।
এমন ছন্দে থাকা একজন খেলোয়াড়কে কৃত্রিম টার্ফে খেলিয়ে কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চায়নি মিশর। বিশেষ করে জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের পাশাপাশি সামনে ক্লাব ফুটবলের ব্যস্ত সূচি থাকায় সালাহকে সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ সুদানের বিপক্ষে ম্যাচে সালাহ না থাকায় মিশরের আক্রমণভাগে অন্য খেলোয়াড়দের দায়িত্ব বাড়বে। কোচ হোসাম হাসানকে এখন সালাহর অনুপস্থিতিতে দলের আক্রমণভাগ সাজাতে হবে। তবে সালাহকে বিশ্রাম দেওয়ার সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে তিনি চোটে পড়েছেন। বরং ইএফএর বিবৃতি অনুযায়ী, মূল কারণ মাঠের কৃত্রিম সারফেস এবং খেলোয়াড়কে সুরক্ষিত রাখার পরিকল্পনা।
জাতীয় দলের হয়ে সালাহর দীর্ঘমেয়াদি অবদান বিবেচনায় নিয়েই হয়তো এমন সতর্ক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের বাছাইপর্বে প্রতিটি ম্যাচ গুরুত্বপূর্ণ হলেও একটি ম্যাচের জন্য দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে ঝুঁকিতে ফেলতে চায়নি মিশরের টিম ম্যানেজমেন্ট।
দক্ষিণ সুদানের বিপক্ষে মঙ্গলবারের ম্যাচে তাই মাঠে দেখা যাবে না মিশরের সবচেয়ে পরিচিত মুখ সালাহকে। তবে তার অনুপস্থিতিতে দলটি কেমন পারফর্ম করে এবং বাছাইপর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মিশর কেমন ফল করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। সালাহর জন্য অবশ্য সামনে রয়েছে ক্লাব ও জাতীয় দলের আরও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। সেই ম্যাচগুলোর জন্য তাকে পুরোপুরি প্রস্তুত রাখাই মিশরের বর্তমান সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য।
পড়ুন:পেনাল্টি মিসের মাশুল ইংল্যান্ডের, ওয়েম্বলিতে স্পেনের জয়
ইমি/


