‘ফোক হরর’ ঘরানার সিনেমায় নিজের স্বতন্ত্র নির্মাণশৈলীর জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত মার্কিন নির্মাতা রবার্ট এগার্স। ইতিহাসের বিভিন্ন সময় ও লোককথাকে আধুনিক সিনেমার ভাষায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার রয়েছে আলাদা দক্ষতা। ‘দ্য উইচ’, ‘দ্য লাইটহাউস’ এবং ‘নসফেরাতু’র মতো সিনেমায় ভৌতিক আবহ, রহস্য ও অস্বস্তিকর পরিবেশের যে মিশেল তিনি তৈরি করেছেন, এবার সেই ধারাতেই হাজির হচ্ছেন নতুন সিনেমা ‘ওয়্যারউলফ’ নিয়ে।
মধ্যযুগের ইংল্যান্ডকে পটভূমি করে নির্মিত হয়েছে সিনেমাটি। গল্পের সময়কাল ১৩ শতক। সেই সময়ের লোককথা, ভয় এবং অতিপ্রাকৃত আতঙ্ককে কেন্দ্র করে এগিয়েছে সিনেমার কাহিনি। সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে ‘ওয়্যারউলফ’-এর ট্রেলার। আর ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই সিনেমাটি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে আলোচনা।
ট্রেলারের শুরু থেকেই রয়েছে রহস্যময় ও গা ছমছমে পরিবেশ। অন্ধকারে ঢাকা মধ্যযুগীয় লোকালয়, অস্বাভাবিক শব্দ, আতঙ্কিত মানুষের মুখ এবং একের পর এক রহস্যময় ঘটনার মধ্য দিয়ে গল্পের আভাস দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে দর্শকদের নজর কেড়েছে সিনেমার প্রধান তিন চরিত্রের উপস্থিতি।
‘ওয়্যারউলফ’-এ প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন অ্যারন টেলর-জনসন। ট্রেলারে তাকে এমন এক ব্যক্তির চরিত্রে দেখা যায়, যিনি এক ভয়ংকর অভিশাপের শিকার হয়ে ধীরে ধীরে রক্তপিপাসু পশুর রূপ ধারণ করতে থাকেন। মানুষের শরীর ও মানসিকতার সঙ্গে পশুসত্তার এই দ্বন্দ্বই সিনেমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে ট্রেলার থেকে ধারণা পাওয়া যায়।
অ্যারনের চরিত্রের স্ত্রী হিসেবে দেখা যাবে লিলি-রোজ ডেপকে। স্বামীর অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তিনি। তবে ভয় পেয়ে দূরে সরে যাওয়ার বদলে স্বামীকে সেই অভিশাপ থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেন। ট্রেলারে তার চরিত্রের মধ্যে যেমন আতঙ্ক দেখা গেছে, তেমনি প্রিয় মানুষকে বাঁচানোর তীব্র আকুতিও ফুটে উঠেছে।
অন্যদিকে, সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন হলিউডের খ্যাতিমান অভিনেতা উইলেম ড্যাফো। ট্রেলারে তাকে এক যোদ্ধার চরিত্রে দেখা গেছে। লোকালয়ের মানুষকে ভয়ংকর নেকড়েদের হাত থেকে রক্ষা করার সংকল্প নিয়ে এগিয়ে আসেন তিনি।
ট্রেলারের একটি দৃশ্যে উইলেম ড্যাফোর চরিত্রকে দৃঢ় কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, ‘প্রতিটি নেকড়েই মরবে!’ তার এই সংলাপের সঙ্গে সঙ্গে গল্পের উত্তেজনাও আরও বাড়তে থাকে। এরপর ট্রেলারের শেষদিকে দেখা যায় অ্যারন টেলর-জনসনের চরিত্রের শরীরে অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থায় তার কাঁপতে থাকা শরীর এবং ভয়ংকর পশুরূপে রূপান্তরের ঝলক দর্শকদের মধ্যে শিহরণ তৈরি করেছে।
রবার্ট এগার্সের সিনেমায় ইতিহাস ও লোককথার সঙ্গে ভৌতিক আবহের মিশেল নতুন কিছু নয়। ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য উইচ’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক পরিচিতি পান। এরপর ‘দ্য লাইটহাউস’-এ ভিন্নধর্মী মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের আবহ তৈরি করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ব্রাম স্টোকারের বিখ্যাত ভ্যাম্পায়ার চরিত্রকে কেন্দ্র করে নির্মাণ করেন ‘নসফেরাতু’।
‘নসফেরাতু’তে অ্যারন টেলর-জনসন, লিলি-রোজ ডেপ ও উইলেম ড্যাফো একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। ২০২৪ সালের ক্রিসমাসে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দেয়। বক্স অফিসেও সিনেমাটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়। বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৮০ মিলিয়ন ডলার আয় করার পাশাপাশি সিনেমাটি চারটি কারিগরি বিভাগে অস্কার মনোনয়নও পেয়েছিল।
‘নসফেরাতু’র পর একই তিন অভিনয়শিল্পীকে আবারও একসঙ্গে পর্দায় নিয়ে আসছেন এগার্স। ফলে ‘ওয়্যারউলফ’ ঘিরে দর্শকদের আগ্রহের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে এই পুনর্মিলন। তবে এবার ভ্যাম্পায়ারের বদলে গল্পের কেন্দ্রে থাকছে ওয়্যারউলফ বা নেকড়ে-মানবের আতঙ্ক।
সিনেমাটির গল্পে মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডের পরিবেশকে কতটা বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরা হয়েছে, সেটিও এগার্সের ভক্তদের আগ্রহের বিষয়। তার আগের সিনেমাগুলোতে নির্দিষ্ট সময়কাল, পোশাক, স্থাপত্য, ভাষা ও পরিবেশ নির্মাণে বিশেষ গুরুত্ব দেখা গেছে। ‘ওয়্যারউলফ’-এর ট্রেলারেও সেই নির্মাণশৈলীর ছাপ রয়েছে।
বিশেষ করে ট্রেলারের অন্ধকারাচ্ছন্ন দৃশ্য, পুরোনো স্থাপত্য, কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ এবং চরিত্রগুলোর আতঙ্কিত মুখভঙ্গি সিনেমাটির আবহ সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছে। তবে গল্পের মূল রহস্য এবং অ্যারন টেলর-জনসনের চরিত্রের অভিশাপের প্রকৃত কারণ এখনো পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি।
‘ওয়্যারউলফ’ নিয়ে আন্তর্জাতিক সিনেমাপাড়ায় ইতোমধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে আরও একটি কারণে। সিনেমাটিতে একদিকে যেমন রয়েছে রবার্ট এগার্সের নির্মাণশৈলী, অন্যদিকে অভিনয় করছেন অ্যারন টেলর-জনসন, লিলি-রোজ ডেপ ও উইলেম ড্যাফোর মতো পরিচিত মুখ। ‘নসফেরাতু’র পর এই তিন তারকাকে আবারও একসঙ্গে দেখতে পাওয়ায় সিনেমাপ্রেমীদের কৌতূহলও বেড়েছে।
ট্রেলার দেখে আপাতত বোঝা যাচ্ছে, ‘ওয়্যারউলফ’ শুধু একটি অতিপ্রাকৃত প্রাণীর গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অভিশাপ, পারিবারিক সম্পর্ক, ভয় এবং বেঁচে থাকার লড়াই। একজন মানুষ কীভাবে ধীরে ধীরে নিজের মানবিক সত্তা হারিয়ে একটি ভয়ংকর প্রাণীতে পরিণত হয় এবং তাকে ঘিরে তার কাছের মানুষদের জীবনে কী ধরনের সংকট তৈরি হয়—সিনেমাটির গল্পে সেই বিষয়গুলোই গুরুত্ব পেতে পারে।
সব মিলিয়ে রবার্ট এগার্সের নতুন সিনেমা ‘ওয়্যারউলফ’ ঘিরে এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে প্রত্যাশা। ‘দ্য উইচ’, ‘দ্য লাইটহাউস’ ও ‘নসফেরাতু’র পর এবার নেকড়ে-মানবের অন্ধকার জগৎকে তিনি কীভাবে পর্দায় তুলে ধরেন, সেটিই দেখার অপেক্ষা। আগামী ২৫ ডিসেম্বর, বড়দিন উপলক্ষে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে সিনেমাটির।


