রাজস্ব আয়ে রেকর্ড, সক্ষমতা বাড়ছে মোংলা বন্দরের: চেয়ারম্যান

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি মোংলা বন্দরে জাহাজ আগমন, কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পাশাপাশি রাজস্ব আয়েও ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়েও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দরটি।

বিজ্ঞাপন

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরে ৮১৫টি জাহাজ এসেছে। এ সময়ে ১ কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ১৮ লাখ ৩৯ হাজার মেট্রিক টন বা ১৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি।

কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২৫ হাজার টিইইউজ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে হ্যান্ডলিং হয়েছে ২৯ হাজার ৭১৪ টিইইউজ। আগের অর্থবছরের তুলনায় বেড়েছে ৮ হাজার ২৫৮ টিইইউজ বা ৩৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রেও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে মোংলা বন্দর। ৩৪৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয় হয়েছে ৩৮৭ কোটি ৯৫ লাখ ১২ হাজার টাকা। আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব বেড়েছে ৪০ কোটি ৮২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা বা ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা এনইউপি, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি বলেন, “মোংলা বন্দরের সক্ষমতা ও কর্মচাঞ্চল্য বাড়ানোর পাশাপাশি বন্দর ব্যবহারকারী ও সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি, কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং বাড়ানো এবং বন্দরের সেবার মান উন্নয়নে আমাদের কর্মপরিকল্পনা অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতে মোংলাকে আরও সক্ষম ও আধুনিক বন্দর হিসেবে গড়ে তুলতে নাব্যতা, অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।”

মোংলা বন্দরের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ দীর্ঘ ১৪৪ কিলোমিটার চ্যানেলের নাব্যতা ধরে রাখা। বর্তমানে জেটির সামনে ৭ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ানোর সুবিধা রয়েছে। চলমান ড্রেজিং কার্যক্রম শেষ হলে আগামী ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যে ৯ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ জেটিতে ভেড়ানোর সুবিধা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।

এ ছাড়া পাঁচ বছর মেয়াদি সংরক্ষণ ড্রেজিং প্রকল্পের আওতায় পশুর চ্যানেলের বিভিন্ন এলাকায় ৩৩০ দশমিক ৯০ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং করা হবে। জুন ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ৫ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জেটি পর্যন্ত ৯ দশমিক ৫ থেকে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।

বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে অবকাঠামোগত পরিবর্তনেরও প্রস্তুতি চলছে। জিটুজি চায়না অর্থায়নে ‘মোংলা বন্দরের সুবিধাদির সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় দুটি কনটেইনার জেটি, কনটেইনার ইয়ার্ড এবং বিপজ্জনক কার্গো হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩৬৮ মিটার দৈর্ঘ্যের দুটি কনটেইনার জেটি, ৮৭ হাজার ৬০০ বর্গমিটার লোড কনটেইনার ইয়ার্ড এবং ৩৪ হাজার ১৭০ বর্গমিটার খালি কনটেইনার ইয়ার্ড নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে ১ কোটি ৫০ লাখ টন কার্গো এবং ৪ লাখ টিইইউজ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা তৈরি হবে।

এ প্রকল্পের আওতায় ‘Expansion and Modernization of Mongla Port Facilities’ শীর্ষক কাজের চুক্তিও গত ২৫ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষর হয়েছে।

মোংলা বন্দরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় এটিকে ‘ফার্স্ট কলিং পোর্ট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ যেন অন্য বন্দর হয়ে ঘুরে না এসে সরাসরি মোংলায় আসতে পারে, সেই সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।

এ জন্য কনটেইনারবাহী জাহাজের সংখ্যা বাড়ানো, তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিপণ্য মোংলা দিয়ে নিয়মিত পরিবহন এবং সিঙ্গাপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বন্দরের সঙ্গে সরাসরি ফিডার সার্ভিস চালুর উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

একই সঙ্গে খুলনা-মোংলা ও খুলনা-ভাঙ্গা মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা এবং খুলনা-মোংলা রেলপথে নিয়মিত ওয়াগন ও কনটেইনার পরিবহন চালুর বিষয়টিও বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।

বন্দর উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ‘মোংলা বন্দরের আধুনিক বর্জ্য ও নিঃসৃত তেল অপসারণ ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পটি ২০২৫ সালের জুনে শেষ হয়েছে। এর মাধ্যমে বন্দরে চলাচলকারী জলযান ও শিল্পকারখানার বর্জ্য সংগ্রহ করে পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এর ফলে জাহাজের বর্জ্য নদী ও সমুদ্রে নিক্ষেপ রোধ, পশুর চ্যানেল ও আশপাশের নদ-নদীকে তেল দূষণ থেকে সুরক্ষা এবং সুন্দরবনের ওপর দূষণের চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

২০২৭ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত মোংলা বন্দরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা রয়েছে। এতে আধুনিক কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, জয়মনিরগোলে জেটি ও কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ, মাল্টিপারপাস জেটি, হিরণ পয়েন্ট পাইলট স্টেশনের উন্নয়ন, নদীশাসন, নেভিগেশনাল এইড সংগ্রহ এবং ভিটিএমআইএস সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

বর্তমানে বন্দরের বার্ষিক সক্ষমতা ১ হাজার ৫০০ জাহাজ, ১ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন কার্গো, ১ লাখ টিইইউজ কনটেইনার এবং ২০ হাজার গাড়ি হ্যান্ডলিংয়ের।

মঙ্গলবার সকালে খালিশপুরের মোংলা পোর্ট অডিটোরিয়ামে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব তথ্য তুলে ধরে বন্দর কর্তৃপক্ষ। অনুষ্ঠানে চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা ছাড়াও সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর মোঃ শফিকুল ইসলাম সরকার, সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) প্রকৌশলী শেখ শওকত আলীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জাহাজ, কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি করবে।

পড়ুন : অপরাধের ময়দানে কিশোর গ্যাং, আড়ালের ‘বড় ভাই’ কারা?

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন