রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাড়া-মহল্লায় ভয়ংকর রূপ নিয়েছে ‘কিশোর গ্যাং’। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে খুন—কিশোরদের জড়িয়ে একের পর এক অপরাধের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় সামনে আসছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নাম; কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, তাদের পেছনে থাকা কথিত ‘বড় ভাই’রা কারা? রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের ছত্র ছায়ায় কিশোরদের ব্যবহার করে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে কি কোনো পক্ষ? তাদের ভূমিকা নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর, উত্তরা, দক্ষিণখান, মিরপুর ও কেরানীগঞ্জ এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত সবচেয়ে বেশি বলে জানা গেছে। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বাইরে দেশের বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় সক্রিয় রয়েছে ২২৭টি কিশোর গ্যাং। এসব গ্যাংয়ের সদস্য সংখ্যা ২ হাজার ৫৫০। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরেই রয়েছে ৯৮টি গ্যাং। খুলনা মহানগরে ৭, রাজশাহীতে ১৩, সিলেটে ১৫ এবং গাজীপুর মহানগরে ১৩টি গ্যাং রয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য মহানগর ও বিভিন্ন জেলা শহরেও বেশ কিছু গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে নোয়াখালীতে—২৫টি।
রাজধানীতে সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ১৫৯টি। এসব গ্যাংয়ের সদস্য ১ হাজার ৮১২ জন। রাজধানীর মধ্যে মোহাম্মদপুরে সবচেয়ে বেশি ২৭টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এসব গ্যাংয়ে সদস্য সংখ্যা সাড়ে ৩০০। এরপরই রয়েছে পল্লবী থানা এলাকা, যেখানে ১৬টি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য সংখ্যা ১৬০।
নেপথ্যে ‘বড় ভাই’ ও রাজনৈতিক ছায়া
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাড়া-মহল্লায় এসব কিশোর গ্যাং বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে উঠছে না। স্থানীয় কথিত ‘বড় ভাই’ এবং রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখা ও মিছিলে লোক বাড়ানোর কাজে কিশোরদের ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ জন্য তাদের অর্থ, মোটরবাইক ও মাদক দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি কুমিল্লায় একটি রাজনৈতিক দলের মিছিলে শীর্ষ কিশোর গ্যাং লিডার ‘রতন’-এর উপস্থিতির ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা দেখা যায়।
ঢাকার বাইরে চিত্রও ভয়াবহ
কিশোর গ্যাং ও বখাটেদের বিরুদ্ধে কুমিল্লায় পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে তিন দফায় ১ হাজার ২৯৩ জনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ রোববার সন্ধ্যা থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত জেলার ১৮টি থানায় জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সমন্বয়ে অভিযান চালিয়ে ৪১৫ জনকে আটক করা হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে—এমন বিভিন্ন স্থান, কিশোরদের আড্ডাস্থল ও অপরাধ প্রবণ এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে। গত কয়েক দিনের ধারাবাহিক অভিযানের ফলে একদিকে কুমিল্লাবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে, অন্যদিকে অপরাধ প্রবণতাও কমে আসছে। তিনি বলেন, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। উঠতি বয়সী কিশোররা যাতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য নিয়মিত এ ধরনের অভিযান চালানো হচ্ছে।
চাঁদপুরে ৩৭০ জন আটক
কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ও কিশোর অপরাধ ঠেকাতে চাঁদপুরের আট উপজেলায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩৭০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। সোমবার সকালে চাঁদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) নাদিয়া নূর জানান, রোববার সন্ধ্যার পর চালানো এ অভিযানে ৩৭০ জনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, আটকদের মধ্যে কয়েকজনের মাদক ও অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শকের (ডিআইজি) নির্দেশে এবং চাঁদপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মিজানুর রহমানের নির্দেশনায় জেলার সব থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্যদের সমন্বয়ে অভিযানটি পরিচালিত হয়। পুলিশ জানায়, কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে চাঁদপুর সদরে ৩৫ জন, হাইমচরে ৪৮, ফরিদগঞ্জে ৪১, হাজীগঞ্জে ৩৭, কচুয়ায় ৬২, শাহরাস্তিতে ৪৫, মতলব উত্তরে ৫২ এবং মতলব দক্ষিণে ৩৬ জনকে আটক করা হয়। এ ছাড়া গোয়েন্দা পুলিশ জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আরও ১৪ জনকে আটক করে। তবে যাদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তাদের অভিভাবকদের ডেকে সন্তানদের বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরে অভিভাবকদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
পাশাপাশি সন্তানদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখা, পড়াশোনায় মনোযোগী করা এবং ভবিষ্যতে যাতে তারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক করেছে পুলিশ।
চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, “কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে পারিবারিক নজরদারির অভাব ও অনলাইন কার্যক্রমসহ নানা বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। “কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ ও কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি অভিভাবকদের আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে।”
লক্ষ্মীপুরে ২৪৪ জন আটক
কিশোর গ্যাং ও বখাটেদের বিরুদ্ধে লক্ষ্মীপুরের ছয় থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ২৪৪ জনকে আটক করেছে জেলা পুলিশ। পাঁচ ঘণ্টার অভিযানে আটক ব্যক্তিদের বয়স ১৪ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। কিশোর বয়সী বখাটেদের উৎপাত ও অপরাধ প্রবণতার অভিযোগের ভিত্তিতে জেলা পুলিশ, গোয়েন্দা ও থানা পুলিশ যৌথভাবে এসব অভিযান চালায়।
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে জেলার বিভিন্ন থানা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে শিক্ষার্থীদের নানাভাবে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগও রয়েছে। প্রায়ই কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে মারামারিসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডের ঘটনাও ঘটছে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলার প্রতিটি থানা এলাকায় একযোগে অভিযান শুরু করে পুলিশ। অভিযানে প্রথম ধাপে ২৪৪ জনকে আটক করা হয়। আটকদের মধ্যে লক্ষ্মীপুর সদর থানায় ৪২ জন, চন্দ্রগঞ্জ থানায় ২১ জন, রায়পুর থানায় ৪৪ জন, রামগঞ্জ থানায় ৩৭ জন, রামগতি থানায় ৪৪ জন এবং কমলনগর থানায় ৫৬ জন রয়েছেন। আটক ব্যক্তিদের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা যাচাই করা হচ্ছে। যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নোয়াখালীতে ১৭১ কিশোর গ্যাং সদস্য আটক
কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ তৎপরতা প্রতিরোধ এবং কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে নোয়াখালীর বিভিন্ন থানায় ২৫টি কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। এসব অভিযানে ১৭১ কিশোর গ্যাং সদস্যকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, আটক ১৭১ জনের মধ্যে ১৬০ জন কিশোর। তাদের মুচলেকা নিয়ে এবং শপথ পড়িয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি ১১ জনের মধ্যে সাতজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আর চারজনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হয়েছে।
থানাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, সুধারাম মডেল থানা ও হাতিয়া থানায় ২৯ জন, বেগমগঞ্জ মডেল থানায় ২০ জন, সেনবাগ থানায় ২১ জন, চাটখিল থানায় আটজন, চরজব্বর থানায় ১০ জন এবং কবিরহাট থানায় ১১ জনকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
‘শর্টকাট সমাধান’ নয়
কিশোর গ্যাং নির্মূলে শুধু সদস্যদের গ্রেফতার করাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে এসআরবি। এসব অপরাধী গ্রুপের মূলহোতাদের শনাক্ত করে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গতকাল সোমবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসআরবি-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নায়মুল হাসান এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের প্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের গ্রেফতার করলে গ্রুপগুলো দুর্বল হয়ে যায়। তাদের গ্রেফতার করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কৌশলের অংশ। যদি শর্টকাট সলিউশন চাওয়া হয়, এটা ভুল হবে। এ ধরনের গ্রুপ যেন ভবিষ্যতে গড়ে উঠতে না পারে এবং তাদের কার্যক্রম যেন বন্ধ করা যায়, সে বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনা আছে।’
এসআরবি-২-এর অধিনায়ক আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে তাদের গবেষণা ও উন্নয়ন (আরএনডি) সেল কাজ করছে। খুব শিগগির এসব অপরাধী গ্রুপের কার্যক্রমের পেছনের কারণগুলো চিহ্নিত করে আরও বিস্তৃতভাবে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা নেওয়া হবে।
কিশোর গ্যাং নির্মূলে মূলহোতাদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
নয়মুল হাসান বলেন, ‘আপনি যদি শর্টকাট সলিউশন চান, এটা ভুল হবে। এ ধরনের গ্রুপ (কিশোর গ্যাং) যাতে ভবিষ্যতে গড়ে উঠতে না পারে এবং তাদের কার্যক্রম যাতে বন্ধ করা যায়, সে বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনা আছে।’ এসআরবি-২-এর অধিনায়ক আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে তাদের গবেষণা ও উন্নয়ন (আরএনডি) সেল কাজ করছে। খুব শিগগিরই এসব অপরাধী গ্রুপের কার্যক্রমের পেছনের কারণগুলো চিহ্নিত করে আরও বিস্তৃতভাবে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা নেওয়া হবে।
কিশোর গ্যাং দমনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চলছে। আটক করা হচ্ছে শত শত কিশোরকে, যাচাই-বাছাইয়ের পর নেওয়া হচ্ছে আইনি ব্যবস্থা। তবে একই সঙ্গে গুরুত্ব পাচ্ছে কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণ এবং তাদের পেছনে যারা আছে তাদের চিহ্নিত করার বিষয়টি।
পড়ুন:
আর/


