মঙ্গল গ্রহের প্রাচীন জলবায়ু ও পানির ইতিহাস নিয়ে নতুন তথ্য পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। নাসার পারসিভারেন্স রোভারের পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা জানিয়েছেন, মঙ্গলের জেজেরো ক্রেটারে শুধু একটি প্রাচীন হ্রদের অস্তিত্বই ছিল না; বরং বিভিন্ন সময়ে সেখানে একাধিক ধরনের পানিপ্রবাহ ও ভূগর্ভস্থ তরলের চলাচল ঘটেছিল। এই আবিষ্কার মঙ্গল গ্রহের প্রাচীন পরিবেশ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের প্রচলিত ধারণাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সম্প্রতি ‘কমিউনিকেশনস আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ সাময়িকীতে এ-সংক্রান্ত গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় জেজেরো ক্রেটারের ভেতরের ‘মার্জিন ইউনিট’ নামের একটি ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলের শিলা ও খনিজ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের নতুন পর্যবেক্ষণ বলছে, এই অঞ্চলটি একটি মাত্র প্রাচীন হ্রদের পানির স্রোতে তৈরি হয়নি। বরং দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে পানির প্রবাহ ও রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে সেখানকার শিলাগুলোর গঠন বদলেছে।
এর আগে গবেষকদের ধারণা ছিল, জেজেরো ক্রেটারের মার্জিন ইউনিটে মূলত পাললিক শিলা থাকতে পারে। কিন্তু পারসিভারেন্স রোভারের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ওই অঞ্চলের অধিকাংশ শিলা পাললিক নয়; এগুলো মূলত আগ্নেয় বা ইগনিয়াস প্রকৃতির। এসব শিলা আবার অলিভিন নামের একটি খনিজে সমৃদ্ধ।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত পারডু ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী ক্যান্ডিস বেডফোর্ড জানান, এসব শিলা মূলত মঙ্গল গ্রহের ভূ-পৃষ্ঠের অনেক গভীরে ম্যাগমা ঠান্ডা হয়ে তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ভূতাত্ত্বিক ক্ষয় ও অন্যান্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিলাগুলো ধীরে ধীরে ভূ-পৃষ্ঠের কাছাকাছি উঠে আসে।
শিলার ভেতরের খনিজ স্ফটিক বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন। তাদের মতে, পরবর্তী সময়ে অন্তত তিনটি পৃথক ধাপে এসব শিলা পানির সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয়। অর্থাৎ জেজেরো ক্রেটারের ওই অঞ্চলে শুধু একবার পানি প্রবাহিত হয়নি; বরং ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ধরনের তরল সেখানে সক্রিয় ছিল।
গবেষণায় শনাক্ত প্রথম ধাপে কার্বন ডাইঅক্সাইডসমৃদ্ধ ভূগর্ভস্থ পানি অলিভিনসমৃদ্ধ আগ্নেয় শিলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। এই পানি শিলার ফাটল দিয়ে যাওয়ার সময় সেখানে কার্বনেট খনিজ তৈরি হয়। ফলে শিলার মধ্যে পানির প্রাচীন উপস্থিতির রাসায়নিক চিহ্ন সংরক্ষিত হয়েছে।
এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে জেজেরো ক্রেটারের প্রাচীন হ্রদের পানি অথবা পরিবর্তনশীল ভূগর্ভস্থ পানির প্রভাবে শিলাগুলোর খনিজগত পরিবর্তন ঘটে। এ সময় শিলার মধ্যে সিলিকা জমা হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ প্রাচীন হ্রদ ও ভূগর্ভস্থ পানির গতিশীলতার সঙ্গে ওই অঞ্চলের শিলার রাসায়নিক পরিবর্তনের সম্পর্ক থাকতে পারে।
হাওয়াই ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী এলেনি রাভানিস জানান, অলিভিন যখন পানির সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কার্বনেটে রূপান্তরিত হয়, তখন সিলিকা অবশিষ্ট হিসেবে থেকে যেতে পারে। শিলার মধ্যে পাওয়া এই ধরনের খনিজ চিহ্ন থেকেই বিজ্ঞানীরা পানির বিভিন্ন পর্যায়ের কার্যকলাপ সম্পর্কে ধারণা করছেন।
তৃতীয় পর্যায়ে আরও ভিন্ন ধরনের তরল কার্যকলাপের প্রমাণ মিলেছে। গবেষকদের মতে, আগ্নেয় শিলার মধ্য দিয়ে একসময় উষ্ণ তরল বা হাইড্রোথার্মাল তরল প্রবাহিত হয়েছিল। এর ফলে শিলার ফাটলের মধ্যে ক্যালসিয়াম সালফেট ও ফ্লোরাইটের খনিজ শিরা তৈরি হয়।
বিশেষ করে ফ্লোরাইটের উপস্থিতি বিজ্ঞানীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এই খনিজের উপস্থিতি ওই অঞ্চলে অতীতে উত্তপ্ত ভূগর্ভস্থ তরল বা হাইড্রোথার্মাল কার্যকলাপের সম্ভাবনার পক্ষে শক্তিশালী ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ মঙ্গলের প্রাচীন ভূগর্ভে নির্দিষ্ট সময়ে শুধু পানি নয়, তাপপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত উষ্ণ তরলও সক্রিয় ছিল।
গবেষণাটি পরিচালনার ক্ষেত্রে পারসিভারেন্স রোভারের মাস্তুলে থাকা সুপারক্যাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই যন্ত্রের সাহায্যে মার্জিন ইউনিটের ১৮৫টির বেশি শিলা পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। শিলাগুলোর গঠন, খনিজ উপাদান এবং রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করে গবেষকেরা মঙ্গল গ্রহের ওই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন।
নতুন এই গবেষণার ফলে জেজেরো ক্রেটারের প্রাচীন পরিবেশ সম্পর্কে আগের ধারণায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আগে একটি প্রাচীন হ্রদকে কেন্দ্র করে ওই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হলেও নতুন তথ্য বলছে, সেখানে পানির গতিবিধি ছিল অনেক বেশি জটিল। ভূগর্ভস্থ পানি, প্রাচীন হ্রদের পানি এবং উষ্ণ হাইড্রোথার্মাল তরল—ভিন্ন সময়ে এসব তরল শিলার ওপর প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এই আবিষ্কার মঙ্গল গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের সরাসরি প্রমাণ নয়। এখন পর্যন্ত কোনো জীবিত বা জীবাশ্ম জীবের সরাসরি সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে পানির উপস্থিতি, খনিজের পরিবর্তন এবং হাইড্রোথার্মাল কার্যকলাপের মতো বৈশিষ্ট্য মঙ্গল গ্রহের অতীত পরিবেশকে জীবনের সম্ভাব্য অনুসন্ধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
পৃথিবীতেও কিছু হাইড্রোথার্মাল পরিবেশে অণুজীবের বসবাস দেখা যায়। সে কারণে মঙ্গলে অতীতে একই ধরনের পরিবেশ অণুজীবের জন্য উপযোগী ছিল কি না, তা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও গবেষণা হতে পারে।
সব মিলিয়ে পারসিভারেন্স রোভারের নতুন তথ্য মঙ্গলের প্রাচীন জলবায়ু ও ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। জেজেরো ক্রেটারের মার্জিন ইউনিটে একাধিক পর্যায়ে পানিপ্রবাহ ও উষ্ণ তরলের কার্যকলাপের প্রমাণ পাওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, মঙ্গল গ্রহের একসময়কার পরিবেশ ছিল পরিবর্তনশীল ও ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয়। ভবিষ্যতে এসব শিলা ও খনিজের আরও বিশ্লেষণ মঙ্গলের পানি, জলবায়ু এবং সম্ভাব্য প্রাচীন বাসযোগ্য পরিবেশ সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
পড়ুন:এলপি গ্যাসের বাজারে চরম অস্থিরতা, সরকারের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
ইমি/


