বাজারে এলপিজির সংকট নেই—বিক্রেতাদের এমন দাবির মধ্যেই রাজধানীতে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার। শুধু বাড়তি দামই নয়, সেই দাম দিয়েও অনেক সময় চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার মিলছে না বলে অভিযোগ করছেন ভোক্তারা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে বলেই নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে আমদানির পরিমাণের তথ্যও বলছে, দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলপিজি আসছে। তাহলে সংকট না থাকার পরও কেন বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের, আর কেনই বা চাহিদামতো পণ্য মিলছে না—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে আসছে বাজার তদারকির বিষয়টি।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দোকানে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে গিয়েছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী এক ক্রেতা। তিনি জানতে পারেন, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯৫০ টাকা। অথচ এর আগে একই সিলিন্ডার তিনি কিনেছিলেন ১ হাজার ৬৫০ টাকায়। বাড়তি দাম নিয়ে দোকানির সঙ্গে দর-কষাকষি করেও কোনো লাভ হয়নি। কারণ, তার আগেই সিলিন্ডার নেওয়ার জন্য দোকানে আরও কয়েকজন ক্রেতা অপেক্ষা করছিলেন।
শুধু গৃহস্থালি ব্যবহারকারীরাই নন, এলপিজির বাড়তি দাম সামলাতে গিয়ে চাপে পড়েছেন ছোট ব্যবসায়ীরাও। মঙ্গলবার সকালে চা দোকানি আরিফ ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছেন ১ হাজার ৯৫০ টাকা দরে। তার দাবি, বাজারে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দোকানের জন্য বাড়তি দাম দিয়েই সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। এতে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে।
নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ টাকা বেশি
সেপ্টেম্বর মাসের জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু রাজধানীর অধিকাংশ দোকানে এর চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এই জ্বালানি।
১২ কেজির একটি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকার মধ্যে। ৩৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৪৫ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৬ হাজার টাকার মধ্যে।
এর মধ্যেও চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও বিক্রেতাদের দাবি, বাজারে এলপিজির সংকট নেই। তবে ক্রেতাদের অভিজ্ঞতা বলছে, নির্ধারিত দামে তো নয়ই, বাড়তি দাম দিয়েও অনেক সময় প্রয়োজনীয় সিলিন্ডার সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
একজন ক্রেতা বলেন, যে ডিলারের কাছে যাচ্ছি, তার কাছেই নাকি সিলিন্ডার নেই। ফলে মানুষ নিরুপায়। রান্না করতে হবে, খেতে হবে এ কারণে এলপিজির কোনো বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়েই বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে।
বেশি দামে কেনার দাবি ব্যবসায়ীদের
বিক্রেতাদের বক্তব্য, তারা নিজেরাই বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনছেন। ফলে বিইআরসির নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে লোকসান গুনতে হবে।
একজন বিক্রেতা বলেন, আমরা ১ হাজার ৬৫০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনছি, অথচ সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। বিইআরসির নির্ধারিত দামের সঙ্গে কোম্পানির দামেরও পার্থক্য রয়েছে। ফলে ওই দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণেই আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপি গ্যাস ট্রেডার্স কোঅপারেটিভ সোসাইটির নেতার দাবি, অধিকাংশ কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করতে পারছে না। এ কারণে বাজারে সরবরাহ নিয়ে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
এলপি গ্যাস ট্রেডার্স কোঅপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের ট্রেজারার আবু তাহের খোরশেদ বলেন, পাঁচ দিন, সাত দিন, এমনকি আট দিন অপেক্ষা করে রেশনিং করে আমাদের মাল আনতে হয়। অনেক কোম্পানির কাছে সম্পূর্ণভাবে গ্যাস না থাকায় বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ভোক্তাকেও অবহিত করা হয়েছে। তারা আমাদের বলেছে, নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিষয়টি মনিটরিং করা হবে।
আমদানি হয়েছে দেড় লাখ টনের বেশি
এলপিজির সরবরাহ ও দামের এই পরিস্থিতির কারণ কোথায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ব্যবসায়ীরা একদিকে বেশি দামে পণ্য কেনার কথা বলছেন, অন্যদিকে ভোক্তারা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনছেন। আবার বাড়তি দাম দেওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
কোন জায়গায় সমস্যা হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে সরকারকে এ বিষয়ে সমাধানে এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, এলপিজির বাজার দেখভালের জন্য সরকারের একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্ধারিত হিসাব অনুযায়ী দাম কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদের।
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। সেপ্টেম্বরেও প্রায় কাছাকাছি পরিমাণ এলপিজি আমদানি হয়েছে।
ফলে আমদানির পরিমাণের তথ্যের সঙ্গে বাজারে বাড়তি দামে এলপিজি বিক্রি এবং চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগের বিষয়টিও সামনে এসেছে। একদিকে বাজারে এলপিজির সংকট নেই বলে দাবি করা হচ্ছে, অন্যদিকে নির্ধারিত দামের তুলনায় কয়েকশ টাকা বেশি দিয়েও সিলিন্ডার পেতে ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে কোথায় অসংগতি, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে।
পড়ুন: ২৩ বছর পর ইরাক ছাড়ছে মার্কিন বাহিনী
আর/


