প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো আজ বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ফেনী সফরে যাচ্ছেন তারেক রহমান। তার আগমনকে কেন্দ্র করে ফুলগাজী ও পরশুরামে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যেও দেখা দিয়েছে ব্যাপক প্রত্যাশা। বিশেষ করে বাঁধ নির্মাণ ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনসহ কয়েকটি দাবি তুলে ধরতে চান তারা।
স্থানীয়রা বলেন, বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি এখানে বেগম খালেদা জিয়া মেডিকেল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা তাদের অন্যতম দাবি। তারা বলেন, “এখানে বেগম খালেদা জিয়া মেডিকেল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়, যাই হোক; যেহেতু খালেদা জিয়ার জন্মস্থান এখানে, এটা আমাদের দাবি। আমরা চাই, বরাদ্দ যে দেড় হাজার কোটি টাকা হয়েছে, এই দেড় হাজার কোটি টাকা যেন সেনাবাহিনীর মাধ্যমে এই বাঁধটা স্থায়ীভাবে মেরামত করা হয়।”
সফরসূচি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টায় বাসভবন থেকে সড়কপথে পরশুরামের উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পরশুরামের ঘাটঘর মুহুরী ব্রিজ এলাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে তার।
সেখানে ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ উদ্বোধন করা হবে। এক হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকার এ প্রকল্পের আওতায় বাঁধ পুনর্বাসন, নদীতীর সংরক্ষণ, নদী পুনঃখনন এবং সেচ অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এরপর বেলা ১টা ১৫ মিনিটে পরশুরাম থেকে ফুলগাজী উপজেলার বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজের উদ্দেশে রওনা দেবেন তিনি। বেলা দেড়টায় কলেজ প্রাঙ্গণে পৌঁছে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
পরে বেলা ২টায় ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলার সরকারি ভবনের ছাদে স্থাপিত প্রায় এক মেগাওয়াট ক্ষমতার রুফটপ সোলার সিস্টেম থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যক্রমও উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী।
দিনের শেষভাগের কর্মসূচিতে বেলা ৩টায় ফুলগাজী সরকারি পাইলট হাইস্কুল মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের সম্মানী প্রদান অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তার।
অক্টোবর-নভেম্বরে সারা দেশে একযোগে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের চূড়ান্ত ধাপে যেতে চায় সরকার। একই সময়ে বর্ষার বিরতির পর আবারও শুরু হচ্ছে খাল ও নদী পুনঃখনন কর্মসূচি। পাশাপাশি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এগিয়ে চলছে কৃষক কার্ড বাস্তবায়নের কাজ।
পরিবার, কৃষক ও পানি ব্যবস্থাপনাকে একই নীতিকাঠামোর আওতায় এনে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এগোচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
আজ বিকেলে ফেনীর ফুলগাজী সরকারি পাইলট হাই স্কুল মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই অনুষ্ঠানে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের সম্মানি ভাতা দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রীর ফেনী সফর উপলক্ষে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা ফেনীতে অবস্থান করছেন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচি অনুযায়ী, আজ ফেনীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০ জনের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেবেন। সমাজে সুবিধাবঞ্চিত নারীপ্রধানদের মধ্যে ৫১০ জন ফেনীতে ফ্যামিলি কার্ড পাবেন। পাশাপাশি দুস্থ ও অসহায় ১০০ জনকে বিশেষ অনুদান দেওয়া হবে, যার মধ্যে পাঁচজন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে তা গ্রহণ করবেন।
দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫০ জন বিশেষ অনুদান পাবেন। তাদের মধ্যে পাঁচজন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে অনুদান নেবেন। এ ছাড়া ক্যান্সার, কিডনি রোগ, লিভার সিরোসিস, প্যারালিসিস, হৃদরোগ, লিউকেমিয়া ও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ৩০ জন আর্থিক সহায়তা পাবেন। তাদের মধ্য থেকেও পাঁচজন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে সহায়তা নেবেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে ২০ জন আর্থিক অনুদান পাবেন, যার পাঁচজন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে তা গ্রহণ করবেন।
চলতি বছরের ১০ মার্চ ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ে ১৪ উপজেলায় পাইলট কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরে তিন ধাপে ৫৫ উপজেলায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। সরকার গঠনের ২১ দিনের মধ্যেই কর্মসূচিটি শুরু করা হয়েছিল।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘পাইলট পর্যায়ে কর্মসূচির শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে। গত দুই মাসে সেগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হয়েছে। এখন নিয়মিত ও বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হচ্ছে।’
তিনি জানান, নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ফেনীতে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু হবে। এরপর ১৫ অক্টোবরের পর বড় পরিসরে কার্যক্রম বিস্তৃত করার লক্ষ্য রয়েছে।
অন্যদিকে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষক কার্ডের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৩ লাখ কৃষক। উদ্বোধনী পর্যায়ে ৫৬ জেলার ৭৭ উপজেলার ৭৭টি কৃষি ব্লকের এক লাখ ১০ হাজার ১৬৫ জন কৃষক কৃষি উপকরণ সহায়তা পাবেন। প্রথম দিনেই প্রায় এক লাখ কৃষককে প্রণোদনার আওতায় আনা হবে।
ইতোমধ্যে সাড়ে ১৯ লাখ কৃষকের তথ্য সংগ্রহ সম্পন্ন হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এই সংখ্যা বাড়ানো হবে। প্রত্যেক উপকারভোগী বছরে একবার দুই হাজার ৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবেন। ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরাই এ সুবিধার আওতায় থাকবেন। আপাতত মাঝারি ও বড় কৃষকদের এই কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য দেশব্যাপী দুই কোটি ৪০ লাখ ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষককে আর্থিক সহায়তার আওতায় আনা।
এদিকে বর্ষা শেষ হওয়ায় আবারও শুরু হচ্ছে খাল পুনঃখননের কাজ। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী চার বছরে প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল ও জলাশয় খনন-পুনঃখননের লক্ষ্য রয়েছে। এ বছর এরই মধ্যে ১১০টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। গত ছয় মাসে ৩৭৭ কিলোমিটার খনন-পুনঃখননের কাজ হয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬০ কিলোমিটার। অর্থাৎ লক্ষ্যের চেয়ে ১৭ কিলোমিটার বেশি কাজ হয়েছে।
পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, ফেনীতে এক হাজার ৫৪২ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আগামীকালের (আজ) ফেনী কর্মসূচিতে এ কারণেই খাল-নদী খনন ও পানি ব্যবস্থাপনা আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। মুহুরী ও কহুয়া নদী ঘিরে প্রায় এক হাজার ৫৪২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গত জুনে একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। প্রকল্পটির আওতায় পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া ও সোনাগাজী—এই চার উপজেলায় বাঁধসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, বর্ষার কারণে এপ্রিল থেকে আগস্ট-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নদী, খাল ও জলাশয় পুনঃখননের কাজ বন্ধ ছিল। বর্ষা শেষ হওয়ায় আবারও এ কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। আজ ফেনী থেকে আবার খাল পুনঃখননের কর্মসূচি শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন।
তিনি বলেন, চলতি বছর এরই মধ্যে ১১০টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। গত ছয় মাসে ৩৭৭ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষণা অনুযায়ী সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের মাসিক সম্মানি ভাতা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের দুই লাখ ৫৬ হাজার ৭৪ জন ধর্মীয় সেবাদানকারীকে এই ভাতার আওতায় আনা হবে। এই কর্মসূচির জন্য বাজেটে এক হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
দিনব্যাপী কর্মসূচি শেষে বিকেল ৫টায় সড়কপথে ফেনী থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন প্রধানমন্ত্রী। রাত ৯টার দিকে তার ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
পড়ুন : প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে সরকার
সা/


