শুরুটা ছিল দুর্দান্ত। আক্রমণের পর আক্রমণ, একের পর এক সুযোগ—সব মিলিয়ে ঘরের মাঠে জিনেদিন জিদানের নতুন অধ্যায় জয় দিয়েই শুরু হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত গোলও পেয়েছিল ফ্রান্স। কিন্তু ইতালি হাল ছাড়েনি। দুর্দান্ত লড়াই করে ম্যাচে ফিরে আসে তারা। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে ১-১ গোলে রুখে দিয়ে এক পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়ে ইতালি।
ফ্রান্সের জাতীয় স্টেডিয়ামে শুক্রবার রাতে অনুষ্ঠিত ইউয়েফা নেশনস লিগের ম্যাচে স্বাগতিকদের হয়ে গোল করেন মাইকেল ওলিসে। ৫৫তম মিনিটে দুর্দান্ত এক ফ্রি-কিক থেকে গোল করে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন তিনি। তবে ৬৮তম মিনিটে আলেসান্দ্রো বাস্তোনির গোলে সমতায় ফেরে ইতালি। এরপর ম্যাচের শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স চেষ্টা করেও আর গোলের দেখা পায়নি।
জিদানের কোচিংয়ে ঘরের মাঠে এটিই ছিল ফ্রান্সের প্রথম ম্যাচ। তাই এই ম্যাচ ঘিরে সমর্থকদের মধ্যে ছিল বাড়তি প্রত্যাশা। ম্যাচের শুরুতে অবশ্য ইতালিই কিছুটা এগিয়ে ছিল। নবম মিনিটে গোলের দারুণ সুযোগও পেয়েছিল তারা। বাঁ দিক থেকে আসা একটি পাস পেয়ে দূরের পোস্টে ফাঁকায় বল পেয়েছিলেন মোইজে কিন। কিন্তু তার নেওয়া শট দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন ফ্রান্সের গোলরক্ষক মাইক মিয়াঁ।
এরপর ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে শুরু করে ফ্রান্স। আক্রমণে গতি বাড়াতে থাকে স্বাগতিকরা। তবে প্রথমার্ধে ইতালির রক্ষণ ভাঙতে পারেনি তারা। ৩৭তম মিনিটে প্রথমবার লক্ষ্যে শট নেয় ফ্রান্স। উসমান দেম্বেলের নেওয়া শট অবশ্য সহজেই সামলে নেন ইতালির অধিনায়ক ও গোলরক্ষক জানলুইজি দোন্নারুম্মা।
প্রথমার্ধে দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে। উভয় দলই আটটি করে শট নেয়। তবে লক্ষ্যে ছিল মাত্র একটি করে শট। ফলে গোলশূন্য অবস্থাতেই বিরতিতে যায় দুই দল।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের চিত্র অনেকটাই বদলে যায়। শুরু থেকেই ইতালির ওপর চাপ বাড়াতে থাকে ফ্রান্স। একের পর এক আক্রমণে ইতালির রক্ষণকে ব্যস্ত রাখে স্বাগতিকরা। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই দেজিরে দুয়ে ও উসমান দেম্বেলে ইতালির গোলরক্ষক দোন্নারুম্মাকে পরীক্ষা নেন। দুবারই দক্ষতার সঙ্গে শট ঠেকিয়ে দেন তিনি। মাত্র দুই মিনিট পর মাইকেল ওলিসের নেওয়া শটও প্রতিহত করেন ইতালির গোলরক্ষক।
তবে ৫৫তম মিনিটে আর ফ্রান্সকে থামাতে পারেননি দোন্নারুম্মা। ডি-বক্সের বাইরে ফ্রি-কিক পায় স্বাগতিকরা। রায়ান শেরকি পায়ের টোকায় বল সামান্য এগিয়ে দেন। সেখান থেকে দুর্দান্ত গতির শটে বল জালে পাঠান ওলিসে। তার শক্তিশালী শট এতটাই নিখুঁত ছিল যে দোন্নারুম্মার কিছুই করার ছিল না। ১-০ গোলে এগিয়ে যায় ফ্রান্স।
গোল পাওয়ার পর ফ্রান্সের জয় সময়ের ব্যাপার বলেই মনে হচ্ছিল। নিজেদের মাঠে সমর্থকদের উচ্ছ্বাসের মধ্যে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে জিদানের দল। কিন্তু ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ইতালি।
৬৮তম মিনিটে নিজেদের ভুলেই বিপদ ডেকে আনে ফ্রান্স। বক্সের বাইরে বলের নিয়ন্ত্রণ হারান লুকা দা কুইয়া। আলগা বল পেয়ে দ্রুত বক্সে ঢুকে পড়েন আলেসান্দ্রো বাস্তোনি। ফ্রান্সের গোলরক্ষক মিয়াঁ সামনে এগিয়ে এসে গোলের কোণ ছোট করার চেষ্টা করলেও বাস্তোনি ঠান্ডা মাথায় তাকে পরাস্ত করেন। তার গোলে ১-১ সমতায় ফিরে আসে ইতালি।
সমতা ফেরার পর আবারও জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে ফ্রান্স। নিজেদের মাঠে পূর্ণ তিন পয়েন্ট পাওয়ার জন্য আক্রমণের ধার বাড়ায় তারা। কিন্তু ইতালির গোলবারের নিচে তখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন দোন্নারুম্মা। ফ্রান্সের একাধিক আক্রমণ তিনি একাই প্রতিহত করতে থাকেন।
আদ্রিয়াঁ রাবিও ও এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গার নেওয়া শটও অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন দোন্নারুম্মা। পুরো ম্যাচে তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ ইতালিকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখে। শেষ পর্যন্ত ইতালির এক পয়েন্ট নিশ্চিত করার পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এই গোলরক্ষক।
ম্যাচের শেষদিকে ফ্রান্সের ওপর চাপ আরও বাড়ে। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট আগে বড় ধাক্কা খায় স্বাগতিকরা। মোইজে কিনকে টেনে ধরে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন দাইয়ু উপামেকানো। ফলে ১০ জনের দল হয়ে যায় ফ্রান্স। একজন কম নিয়েও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জয়ের চেষ্টা চালিয়ে যায় জিদানের দল।
তবে শেষ পর্যন্ত আর গোলের দেখা পায়নি ফ্রান্স। ১-১ গোলের ড্র নিয়েই শেষ হয় ম্যাচ। ফলে চলতি নেশনস লিগে প্রথমবার পয়েন্ট হারাল ফ্রান্স। এর আগে টুর্নামেন্টের প্রথম দুই ম্যাচেই ১-০ গোলে জয় পেয়েছিল তারা।
ড্র করেও অবশ্য গ্রুপের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ফ্রান্স। তিন ম্যাচে তাদের সংগ্রহ ৭ পয়েন্ট। ‘এ’ লিগের এক নম্বর গ্রুপে ৬ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বেলজিয়াম। চার পয়েন্ট নিয়ে ইতালি রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে। তুরস্ক এখনো কোনো পয়েন্ট সংগ্রহ করতে পারেনি।
ফলে জিদানের নতুন অধ্যায়ে ঘরের মাঠের প্রথম ম্যাচ জয় দিয়ে শুরু হলো না। বরং ইতালির বিপক্ষে এই ড্র দিয়েই শুরু হলো তার নতুন চ্যালেঞ্জ। ম্যাচে ফ্রান্সের আক্রমণ ছিল ধারালো, কিন্তু সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে তারা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে ইতালি নিজেদের সীমিত সুযোগ কাজে লাগিয়ে সমতা ফিরিয়ে আনে এবং শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক পয়েন্ট নিশ্চিত করে।
ম্যাচটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আরও একটি আবেগঘন অতীত। প্রায় ২০ বছর আগে বিশ্বকাপের মঞ্চে ইতালির বিপক্ষেই জিদানের ক্যারিয়ারের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ঘটেছিল। বিশ্বকাপ ফাইনালে মার্কো মাতেরাজ্জিকে হেডবাট করে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাকে। সেই ঘটনার পর বহু বছর পেরিয়ে গেছে। এবার কোচ হিসেবে ইতালির মুখোমুখি হয়ে ঘরের মাঠে জয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন জিদান। কিন্তু সেই ম্যাচও শেষ হলো সমতায়।
তবে এবার মাঠ ছাড়তে হয়নি জিদানকে। কোচের ভূমিকায় নিজের নতুন যাত্রায় প্রথম ঘরের ম্যাচে জয় না পেলেও দলকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে তার। আর ইতালির বিপক্ষে এই ম্যাচে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে—শুধু আক্রমণ ও সুযোগ তৈরি করলেই হবে না, সেগুলোকে গোলে পরিণত করাও জরুরি।
অন্যদিকে ইতালির জন্য এই ড্র আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর মতো ফল। পিছিয়ে পড়েও ম্যাচে ফিরে এসে তারা দেখিয়েছে, শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য রয়েছে দলটির। আর সেই লড়াইয়ের শেষ প্রান্তে ইতালির সবচেয়ে বড় ভরসার নাম হয়ে ছিলেন দোন্নারুম্মা। তার অসাধারণ গোলকিপিংয়েই শেষ পর্যন্ত জিদানের ফ্রান্সকে জয় থেকে আটকে রাখে ইতালি।


