উপকূলীয় নদীবেষ্টিত ভোলা জেলার চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলার প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র চরফ্যাশন। তবে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য পুরো উপজেলায় নেই একটিও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)। সংকটাপন্ন ও মুমূর্ষু রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন গড়ে শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রোগী নিয়ে বরিশাল বা ঢাকার হাসপাতালে ছুটছেন স্বজনেরা। এতে পথেই প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জনশুমারি তথ্য অনুযায়ী, চরফ্যাশন উপজেলার জনসংখ্যা ৫ লাখ ১৮ হাজার ৮১৭ জন এবং দ্বীপ উপজেলা মনপুরার জনসংখ্যা ৮৯ হাজার ৭৪৫ জন। এই দুই উপজেলার ৬ লাখ ৮ হাজার ৫৬২ জন নাগরিকের চিকিৎসার মূল কেন্দ্র চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এর বাইরে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন চর কুকরি-মুকরি, মুজিবনগরসহ বিভিন্ন নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষও জরুরি চিকিৎসায় এই কেন্দ্রটির ওপর নির্ভর করেন। বাস্তবে এই এলাকার প্রায় ৭ লাখ মানুষ সরাসরি এখান থেকেই প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন।
স্থানীয় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, হৃদরোগ (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট/হার্ট অ্যাটাক), স্ট্রোক, সড়ক দুর্ঘটনায় পলিট্রম্যাটিক ইনজুরি, তীব্র শ্বাসকষ্ট, জটিল প্রসূতি অবস্থা কিংবা মারাত্মক সংক্রমণের মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে রোগীর জীবন বাঁচাতে ‘গোল্ডেন আওয়ার’-এ দ্রুত আইসিইউ ও সিসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়। কিন্তু চরফ্যাশনে নিবিড় পরিচর্যার সুযোগ না থাকায় চিকিৎসকদের একমাত্র উপায় থাকে রোগীকে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অথবা ঢাকায় রেফার করা।
একদিকে দীর্ঘ সড়কপথ, অন্যদিকে নদী ও নৌপথের দূরত্ব। মাঝরাতে কিংবা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নৌযান ও অ্যাম্বুলেন্স না মেলায় অনেক সময় চিকিৎসাসামগ্রী বা কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করতে হয়। এতে মূল হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথিমধ্যে রোগীদের মৃত্যু ঘটে।
সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে নবজাতক ও শিশুরা। নবজাতকের তীব্র শ্বাসকষ্ট (আরডিএস), জন্মগত জটিলতা ও সংক্রমণের জন্য বিশেষায়িত আইসিইউ (এনআইসিইউ) ব্যবস্থা না থাকায় প্রসূতিদের জীবন ও শিশুর ভবিষ্যৎ দুটোই চরম ঝুঁকিতে পড়ছে।
স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা জানান, নদীবিচ্ছিন্ন এই জনপদের ভৌগোলিক দূরত্ব বিবেচনা করে অবিলম্বে চরফ্যাশনে প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের জন্য পৃথক আধুনিক আইসিইউ, সিসিইউ এবং এনআইসিইউ ইউনিট স্থাপন এখন সময়ের দাবি।
এ ব্যাপারে চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আশরাফুল ইসলাম সুমন বলেন, “বিভাগীয় শহর থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরের এই জনপদের ছয় লাখের বেশি মানুষের জরুরি ও জটিল রোগ ব্যবস্থাপনায়, বিশেষ করে কার্ডিয়াক ও সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য আইসিইউ সেবা চালু করা গেলে রোগীরা উপকৃত হতো। মানসম্মত স্বাস্হ্য সেবা নিশ্চিত করতে এখানে আধুনিক ল্যাব ও আইসিইউ ইউনিট স্থাপন এবং তা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ চিকিৎসকমণ্ডলী, টেকনিশিয়ান একান্ত প্রয়োজন।”
পড়ুন : বজ্রপাত নিরোধনে জয়পুরহাটে ২শ তালের চারা রোপন


