সঠিক জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের সঠিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাজেট বণ্টন, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের অন্যতম ভিত্তি। অথচ বাংলাদেশে এখনো জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের হার অর্ধেকের কাছাকাছি। ফলে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ রাষ্ট্রীয় নথিতে তাদের জন্ম-মৃত্যুর তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণের বাইরে রয়েছেন।
সারাদেশে আজ মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) পালিত হচ্ছে ‘জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস-২০২৬’। এবারের দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য—‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’।
নাগরিকদের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনে উদ্বুদ্ধ ও সচেতন করতে ২০২১ সালের ৯ আগস্ট অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রতিবছর ৬ অক্টোবর ‘জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
নির্ভুল জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন শুধু নাগরিক অধিকার সুরক্ষার প্রাথমিক ভিত্তি নয়, বরং সঠিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, সুষম বাজেট বণ্টন, টেকসই জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং সর্বপর্যায়ে রাষ্ট্রীয় সুশাসন নিশ্চিতের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
জন্ম নিবন্ধনের ইতিহাসও বেশ পুরোনো। ১৮৭৩ সালের ২ জুলাই তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার অবিভক্ত বাংলায় প্রথম জন্ম নিবন্ধনসংক্রান্ত আইন জারি করে। পরে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ইউনিসেফ-বাংলাদেশের সহায়তায় পাইলট প্রকল্পের আওতায় দেশের ২৮টি জেলা ও চারটি সিটি করপোরেশনে আধুনিক জন্ম নিবন্ধনের কার্যক্রম নতুন রূপ পায়।
‘জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪’-এর ৮ ধারা অনুযায়ী, শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন এবং কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে মৃত্যু নিবন্ধন সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে শতভাগ নিবন্ধন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে সরকারের। তবে কিছু আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে সেই লক্ষ্যমাত্রা এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে।
জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস উপলক্ষে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি সংস্থা ‘প্রজ্ঞা’ (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের গড় হার যথাক্রমে মাত্র ৫০ ও ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের ক্ষেত্রে এখনো দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী নিবন্ধনের বাইরে রয়েছেন।
সংস্থাটির মতে, সময়মতো ও সঠিক নিবন্ধন না থাকায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এর পাশাপাশি শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে ও মানবপাচারের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকিও বাড়ছে। ফলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে বড় বাধা।
অন্যদিকে মৃত্যু নিবন্ধন না থাকায় সম্পত্তি ভাগাভাগি ও উত্তরাধিকার প্রমাণের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকা, চরাঞ্চল, পাহাড়ি অঞ্চল ও বস্তিতে এসব পারিবারিক বিরোধ আরও জটিল রূপ নিচ্ছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
আইন সংস্কারের তাগিদ দিয়ে প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের বলেন, ‘সুশাসন নিশ্চিতের প্রথম শর্তই হলো নাগরিকদের সঠিক ও সার্বজনীন তথ্য সংরক্ষণ। ২০০৪ সালের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন সংশোধন করে নিবন্ধনের একক দায় কেবল পরিবারের ওপর না রেখে সকল হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রকে সরাসরি নিবন্ধনের দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশের প্রায় ৬৭ শতাংশ শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জন্মগ্রহণ করে। ফলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে সরাসরি জন্ম নিবন্ধনের দায়িত্ব দেওয়া হলে তথ্য বিকৃতি ও ভুয়া নিবন্ধনের সুযোগ কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও বাড়বে।
এতে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি ১৬.৯) ‘সবার জন্য আইনি পরিচয় নিশ্চিতকরণ’ লক্ষ্য অর্জনের পথও সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য তাই শুধু সচেতনতা তৈরির বার্তা নয়; দেশের নাগরিকদের সঠিক পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় তথ্যভান্ডারে তাদের অস্তিত্ব নিশ্চিত করার বাস্তব চ্যালেঞ্জটিকেও সামনে এনেছে।
পড়ুন:
আর/


