সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ভারতের ৭৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তি। বিমানে বসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি চ্যাটজিপিটির সহায়তায় ব্যবসার পরিকল্পনা করছিলেন তিনি। তবে তার ব্যবসায়িক ভাবনার চেয়েও বেশি নজর কেড়েছে প্রযুক্তির এই আধুনিক টুলকে বারবার ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করার বিষয়টি। বয়সকে যে নতুন কিছু শেখার পথে বাধা হতে দেওয়া যায় না, তা যেন নিজের কাজের মধ্য দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন ভিবিআর প্রসাদ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিবিআর প্রসাদ ইন্ডিগোর একটি ফ্লাইটে ভ্রমণ করছিলেন। উড্ডয়নের আগে পাশের আসনে বসে থাকা এক তরুণ যাত্রী তার কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করেন। ওই যাত্রী দেখতে পান, ৭৭ বছর বয়সী প্রসাদ ল্যাপটপ বা মোবাইল ডিভাইসে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে কথোপকথন করছেন এবং নিজের ব্যবসায়িক ধারণা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করছেন।
পরে ‘টেকনোসর’ নামে পরিচিত ওই তরুণ যাত্রী প্রসাদের ছবি এবং চ্যাটজিপিটির সঙ্গে তার কথোপকথনের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশ করেন। পোস্টটি প্রকাশের পর খুব দ্রুতই তা ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক মিলিয়নবার দেখা হয় ওই পোস্ট। মুহূর্তেই ভিবিআর প্রসাদ হয়ে ওঠেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচিত চরিত্র।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে ওই তরুণ যাত্রী লিখেছেন, তার ফ্লাইটে ৭৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তি উড্ডয়নের আগ পর্যন্ত চ্যাটজিপিটির সাহায্যে ভার্টিক্যাল ফার্মিংয়ের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি চ্যাটজিপিটিকে বারবার ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করছিলেন।
এই একটি বিষয়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কৌতূহল তৈরি করে। প্রযুক্তির সঙ্গে অনেকের সম্পর্ক যেখানে এখনো আনুষ্ঠানিক ও যান্ত্রিক, সেখানে ৭৭ বছর বয়সী একজন ব্যক্তি এআইয়ের সঙ্গে এতটা স্বাভাবিকভাবে কাজ করছেন এবং তাকে সম্মানসূচকভাবে ‘স্যার’ বলে ডাকছেন—বিষয়টি অনেকের কাছেই বেশ মজার ও একই সঙ্গে অনুপ্রেরণাদায়ক মনে হয়েছে।
প্রসাদের চ্যাটজিপিটির সঙ্গে কথোপকথনের একটি অংশও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, মাত্র কয়েকটি বাক্যের মধ্যেই তিনি তিনবার চ্যাটজিপিটিকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করেছেন। একপর্যায়ে তিনি লিখেছেন, ‘দারুণ পরামর্শ, স্যার। অনেক ধন্যবাদ। আবার আপনার কাছে আসব, স্যার। আমাকে দুটি ফাইল ডাউনলোড করতে দিন, স্যার।’
এই কথোপকথনের ধরনই নেটিজেনদের নজর কেড়েছে। অনেকে তার ভদ্রতা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরন নিয়ে প্রশংসা করেছেন।
জানা গেছে, প্রসাদ চ্যাটজিপিটির সহায়তায় ভার্টিক্যাল ফার্মিং বা উল্লম্ব কৃষি নিয়ে নিজের ব্যবসায়িক ধারণাকে আরও পরিমার্জন করছিলেন। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির এই পদ্ধতিতে সীমিত জায়গায় বিভিন্ন স্তরে ফসল উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়। শহরাঞ্চল বা জমির সংকট রয়েছে এমন এলাকায় এই ধরনের কৃষি ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আগ্রহ বাড়ছে।
প্রসাদ নিজের ব্যবসায়িক ধারণাকে আরও বাস্তবসম্মত ও কার্যকর করতে চ্যাটজিপিটির কাছে পরামর্শ নিচ্ছিলেন। ব্যবসার পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় তথ্য এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এআইয়ের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন তিনি। আর এই কাজটি তিনি করছিলেন বিমানে বসে, যাত্রা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে।
তার এই কর্মকাণ্ড দেখে পাশের আসনে থাকা তরুণ যাত্রী মুগ্ধ হন। তিনি প্রসাদের বয়সের বিষয়টি উল্লেখ করে তাকে তরুণদের তুলনায়ও বেশি সক্রিয় ও কর্মঠ হিসেবে প্রশংসা করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ছবি ও কথোপকথন ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি পরে জানতে পারেন প্রসাদ নিজেও। এরপর এক্সে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানান, মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়ে তিনি আনন্দিত হয়েছেন।
নিজের কর্মকাণ্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরার জন্য ওই সহযাত্রীকেও ধন্যবাদ জানান তিনি। অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের একটি সাধারণ বিমানযাত্রা যে এত বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠবে, সেটি হয়তো তিনিও ভাবেননি।
তবে প্রসাদের সবচেয়ে বেশি প্রশংসা কুড়িয়েছে এআই নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি। প্রযুক্তিকে শুধু বিনোদন বা সময় কাটানোর মাধ্যম হিসেবে না দেখে জীবনকে আরও উন্নত করার কাজে ব্যবহার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
প্রসাদ বলেন, ‘আমাদের জীবনকে আরও ভালো করার জন্য এআই ব্যবহার করা। সবকিছুই আমাদের হাতে।’ তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে
প্রসাদের ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে বয়স ও প্রযুক্তির সম্পর্কের বিষয়টি। প্রযুক্তি ব্যবহারে তরুণ প্রজন্ম এগিয়ে থাকলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি শেখার আগ্রহ কমে যাওয়াটাই যেন স্বাভাবিক—এমন একটি ধারণা সমাজে রয়েছে। প্রসাদের কর্মকাণ্ড সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
৭৭ বছর বয়সে তিনি নতুন একটি ব্যবসায়িক ধারণা নিয়ে কাজ করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিচ্ছেন এবং নিজের পরিকল্পনাকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছেন। তার এই মানসিকতাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের কাছে সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত হয়েছে।
অনেকে তাকে ‘অনুপ্রেরণাদায়ী’ বলে মন্তব্য করেছেন। কারও মতে, শেখার কোনো বয়স নেই—প্রসাদ তারই উদাহরণ। কেউ আবার তার চ্যাটজিপিটিকে ‘স্যার’ বলার বিষয়টি নিয়ে মজার মন্তব্য করেছেন।
একজন রসিকতা করে লিখেছেন, ভবিষ্যতে যদি কোনো দিন এআই মানুষের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে প্রসাদের এই অতিরিক্ত ভদ্রতার কারণে হয়তো তাকে রেহাই দেওয়া হবে। এমন নানা মজার মন্তব্যে পোস্টটির জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে।
তবে মজার মন্তব্যের আড়ালে প্রসাদের ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দিয়েছে। প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন ব্যবসা, শিক্ষা, গবেষণা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়—প্রসাদের কর্মকাণ্ড যেন সেই কথাই আবার মনে করিয়ে দিল।
একটি বিমানে বসে ব্যবসার পরিকল্পনা করতে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যাওয়া ৭৭ বছরের ভিবিআর প্রসাদ এখন তাই শুধু একজন কৌতূহলী প্রযুক্তি ব্যবহারকারী নন; বরং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ, কর্মস্পৃহা এবং বয়সকে জয় করার মানসিকতারও এক অনন্য উদাহরণ।
পড়ুন:বিজেপিতে যোগ দিলেন কোয়েল মল্লিক
ইমি/


