জলবায়ু ন্যায়বিচারে ঐক্যবদ্ধ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় তরুণরা

জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন ও টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের তরুণরা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) গাজীপুরে আরসিওয়াইএপি ২০২৬ সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠিত হয়।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘রিজিওনাল কনফারেন্স অব ইয়ুথ এশিয়া-প্যাসিফিক (আরসিওয়াইএপি) ২০২৬’। গাজীপুরের সিসিডিবি ক্লাইমেট সেন্টারে মঙ্গলবার শেষ দিনের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে তিন দিনের এ সম্মেলনের সমাপ্তি ঘটে। এর আগে ৩ থেকে ৫ অক্টোবর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে জলবায়ু পরিবর্তন, জলবায়ু রূপান্তর, জলবায়ু অর্থায়ন ও যুব নেতৃত্বাধীন জলবায়ু পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীরা কপ-প্রাক-সিমুলেশনেও অংশ নেন।

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কাঠামো কনভেনশনের (ইউএনএফসিসিসি) অফিসিয়াল চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়ুথ কনস্টিটিউয়েন্সি ‘ইয়ুঙ্গো’র অধীনে স্বীকৃত এ সম্মেলনে ২৮টি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী পাঁচ শতাধিক তরুণ অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১০০ জন ছিলেন আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি। এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা, জাতিসংঘের প্রতিনিধি, গবেষক, নীতিনির্ধারক, উদ্ভাবক, উন্নয়ন সহযোগী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং যুব নেতৃত্বাধীন সংগঠনের সদস্যরাও সম্মেলনে যুক্ত ছিলেন।

সম্মেলনজুড়ে জলবায়ু পদক্ষেপ, জলবায়ু ন্যায়বিচার, সহনশীলতা, তরুণদের নেতৃত্ব, আঞ্চলিক সহযোগিতা, জ্ঞান বিনিময় ও যুব নেতৃত্বাধীন সমাধান নিয়ে আলোচনা হয়। জলবায়ু পদক্ষেপ, টেকসইতা ও জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে বিভিন্ন অধিবেশনে বিশেষজ্ঞ ও জলবায়ু নেতারা তাঁদের মতামত তুলে ধরেন।

সম্মেলনে খন্দকার মোর্শেদ মিলাত, তাহমিনা জামান খান, মৃত্যুঞ্জয় দাস, সুমাইয়া বিনতে সেলিম সুধা, কবিতা বোস ও রুফা খানমসহ বিভিন্ন পর্যায়ের তরুণ নেতা ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। সংলাপ, কর্মশালা, নেটওয়ার্কিং, প্রদর্শনী ও সাইড ইভেন্টের পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীরা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের তরুণদের অগ্রাধিকার ও দাবি নিয়ে ‘রিজিওনাল ইয়ুথ স্টেটমেন্ট’ তৈরির প্রক্রিয়ায় অংশ নেন।

কনফারেন্স অব ইয়ুথ ২১ (সিওয়াই২১) এবং জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১ সামনে রেখে তরুণদের এসব অগ্রাধিকার ও দাবি তুলে ধরা হবে। জলবায়ু ন্যায়বিচার, টেকসইতা ও জলবায়ু অর্থায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তরুণদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই ছিল সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্য।

সমাপনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ইউএন উইংয়ের প্রধান এ কে এম সোহেল জলবায়ু ও উন্নয়নসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তরুণদের কণ্ঠস্বরের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “আমরা প্রতিটি ডলার যে ঋণ নিই, ভবিষ্যতে তা তরুণদেরই শোধ করতে হবে। যে ঋণে আপনার স্বার্থ জড়িত, সেখানে আপনার কণ্ঠও থাকতে হবে। প্রতিটি কথাই প্রমাণ, তথ্য ও বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে বলতে হবে।”

ইউনিসেফ বাংলাদেশের যোগাযোগ ও অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রধান মিগেল মাতেওস মুনিওজ তরুণদের উদ্দেশে বলেন, কপ-৩১-এ যাওয়ার সময় নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে—কার কণ্ঠ এখনো অনুপস্থিত? বাংলাদেশের এনডিসি ৩.০-এ শিশু ও তরুণদের জলবায়ু পদক্ষেপের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। এখন এসব অঙ্গীকার বাস্তবে বাস্তবায়নের সময়।

তিনি বলেন, বৈশ্বিক মঞ্চে জায়গা করে দেওয়ার সময় সবাই সেখানে উপস্থিত থাকতে না পারলেও তরুণদের বাস্তবতা, দাবি ও আশা সঙ্গে রাখতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সিদ্ধান্তে যেন কোনো শিশু অদৃশ্য না থাকে, তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তরুণদের নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের (সিইটিআর) সঙ্গে যুক্ত ইমেরিটাস অধ্যাপক ও বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. আইনুন নিশাত। নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া বোঝার পাশাপাশি প্রমাণভিত্তিক ও তথ্যানির্ভর জলবায়ু পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “নীতির ভাষা শিখুন। তরুণদের অ্যাডভোকেসি হতে হবে প্রমাণভিত্তিক ও তথ্যানির্ভর।”

বক্তাদের বক্তব্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তরুণদের অংশগ্রহণ, তাঁদের দাবির পেছনে প্রমাণ ও তথ্যের ভিত্তি এবং আলোচনার টেবিলে উপস্থিত না থাকা জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা বিবেচনায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

সম্মেলনের শেষ দিনে গাজীপুরের সিসিডিবি ক্লাইমেট সেন্টারে প্রায় ১৫০ জন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি হাতে-কলমে শেখা ও পর্যালোচনার একটি কর্মসূচিতে অংশ নেন। এতে আগের তিন দিনের আলোচনা, প্যানেল সেশন ও মূল শিক্ষাগুলোকে বাস্তব জলবায়ু পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

জলবায়ু প্রতিশ্রুতি, জলবায়ু অর্থায়ন, জলবায়ু রূপান্তর ও জলবায়ু সমাধান বাস্তবে কীভাবে কাজ করে, অংশগ্রহণকারীরা তা বোঝার সুযোগ পান। একই সঙ্গে কপ-৩১-এর জন্য সিমুলেশনভিত্তিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এতে সংলাপ, নেগোসিয়েশন, পিচিং ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা একসঙ্গে যুক্ত করা হয়।

‘পাহাড় থেকে সাগর: জলবায়ু ন্যায়বিচারের জন্য ঐক্যবদ্ধ’ (From Mountains to Sea: United for Climate Justice) প্রতিপাদ্যে এ সম্মেলন আয়োজন করা হয় এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন যুব নেতৃত্বাধীন সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে। বাংলাদেশে আয়োজক সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেছে সিক্টো বাংলাদেশ (Seecto Bangladesh)।

আয়োজকদের মতে, সম্মেলনের মধ্য দিয়ে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের তরুণদের জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন, জলবায়ু রূপান্তর ও প্রমাণভিত্তিক জলবায়ু পদক্ষেপ সম্পর্কে ধারণা আরও বিস্তৃত হয়েছে। ‘রিজিওনাল ইয়ুথ স্টেটমেন্ট’ কপ-৩১-এর পথে তরুণদের অগ্রাধিকার ও দাবিগুলো তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে কাজ করবে।

সম্মেলন শেষে তরুণ প্রতিনিধিরা আরও ন্যায়সংগত, সহনশীল ও টেকসই জলবায়ু ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

পড়ুন:আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াসা বোর্ড চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিলেন বিএনপি নেতা ইদ্রিস মিয়া

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন