“দিল্লিতে রক্তক্ষরণ হলে কলকাতা উঠে দাঁড়ায়, কলকাতার রক্ত বইলেও দিল্লি পাশে থাকবে।”
সোমবার বিকেলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন নেহা বোরা। তখন তার গলা ভাঙা ছিল, কথা বলতেও অস্বস্তি হচ্ছিল। এর আগের দিনই দিল্লিতে পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন তিনি। যন্তর মন্তর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের নারেলা অঞ্চলে নিয়ে যাওয়ার পর সন্ধ্যায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
নেহা বোরা নকশালপন্থী দল সিপিআইএমএল (লিবারেশন)-এর ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বা আইসার সভাপতি। আটকের আগে টানা দুই দিন দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। ওই আন্দোলনে পুলিশের সঙ্গে তার ধস্তাধস্তিও হয়।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চে উঠে নিজের শারীরিক অবস্থার কথা তুলে ধরে নেহা বলেন, “আমার গলা ও শরীরের যা অবস্থা যেমন ভাঙা তেমনই অবস্থা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও এসআরএফটিআইএর।”
ছাত্র আন্দোলনের কারণে গত কয়েক বছর ধরেই নেহা বোরা আলোচনায় রয়েছেন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভারতে মেডিকেল কলেজে ভর্তির প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস মামলায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনশন শুরু হলে অভিজিৎ দীপক ও সোনম ওয়াংচুকের পাশাপাশি নেহা বোরাও আলোচনায় আসেন।
ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র ওই প্রতিবাদের সমর্থনে কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে অনশনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। পরে সিজেপির আন্দোলন থেকে শুরু করে ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনেও তাকে সক্রিয় দেখা যায়।
রাঁচিতে সেই আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে নেহার মুখে কালি ছুড়ে মারা হয়। এ বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, “মুখে কালি ছুড়ে মারলে আমি ভয় পাওয়ার মানুষ নই। দিল্লির আন্দোলনের সময়ে আমি প্যালেট গান এবং লাঠিচার্জেরও মুখোমুখি হয়েছি।”
বিরোধীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেছিলেন, “তারা কি মনে করেন, কালি ছুড়ে মেরে সারা দেশের ছাত্র-যুবদের ক্ষোভকে দমিয়ে রাখা যাবে?”
এরপর বিহারেও সিজেপির বিক্ষোভের সময় গ্রেফতার হওয়া ছাত্রদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে অংশ নেন নেহা। ছাত্র রাজনীতিতে কয়েক বছর ধরে সক্রিয় থাকার পর বর্তমানে তিনি দেশের চলমান যুব ও ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে উঠে এসেছেন। তার দৃঢ় অবস্থান, স্পষ্টভাষী বক্তৃতা ও লড়াকু মনোভাবের কারণে সংবাদমাধ্যমে তাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমেও তার বক্তৃতার একাধিক রিল ভাইরাল হয়েছে।
দিল্লির আন্দোলনে আবার নেহা
বর্তমানে সমর্থকদের নিয়ে আবারও দিল্লিতে আন্দোলনে নেমেছেন নেহা বোরা। এবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছেন তিনি ও তার সমর্থকেরা।
একাধিক বিরোধী দলের অভিযোগ, দেশে চলমান এসআইআর প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মের জন্য জ্ঞানেশ কুমার দায়ী এবং এর ফলে কোটি কোটি মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ হারিয়েছেন।
সম্প্রতি ইংরেজি সংবাদপত্র ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এসআইআর প্রক্রিয়াকে ঘিরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও দুই নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্দোলনের মাঠে
নেহা উত্তরাখণ্ডের বাসিন্দা। দিল্লি ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়ার পর আম্বেদকর ইউনিভার্সিটি, দিল্লি থেকে এমএ সম্পন্ন করেন তিনি। বর্তমানে দিল্লির জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি (জেএনইউ)-তে পিএইচডি করছেন।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ও জেএনইউতে বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের পরিচিত মুখ নেহা। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তাকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গণআন্দোলন ও বামপন্থী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবেও ক্রমশ পরিচিত হয়ে উঠছেন তিনি।
নেহার নেতৃত্বাধীন ছাত্র সংগঠন আইসা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় ছাত্র রাজনীতি করে থাকে। অন্যদিকে যে সিপিআই (এমএল) লিবারেশন পার্টির ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব তিনি দিচ্ছেন, ভারতে দলটির নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সংখ্যা ছয়। এর মধ্যে দুইজন বিহারের ও দুইজন ঝাড়খণ্ডের বিধায়ক। আরও দুইজন বিহারের কারাকাট ও আরা সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য।
আন্দোলন নিয়ে নেহার বক্তব্য
গত মাসে ফ্রন্টলাইনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেহা বোরা যন্তর-মন্তরের আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “যন্তর-মন্তরেও বিপুল সংখ্যক পোস্টার লাগানো হয়েছিল। সেখানে লেখা ছিল, ‘আপনারা গডসেকে বিশ্বাস করেন, আমরা ভগৎ সিংকে বিশ্বাস করি। এটাই আপনার এবং আমার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য, আর সেই কারণেই আপনাদের ক্ষমতা ছাড়তে হবে।’ মানুষ বারবার বলছিল যে, যারা গডসেকে বিশ্বাস করে, তারা এই দেশ শাসন করবে না।”
তিনি আরও বলেছিলেন, “এখানে আরএসএস-এর সেই সংস্কৃতির কথা বলা হচ্ছিল, যা দেশের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।”
“বলা হচ্ছিল, তারা গডসের পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে আর আমরা ভগৎ সিংয়ের পক্ষে। আলোচনা হচ্ছিল এই বিষয়েও যে, তাদের বিভাজনের রাজনীতি দেশকে এমন অবস্থায় এনে ফেলেছে, যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস আর বড় কোনও বিষয় বলে মনে হয় না। কিন্তু এসব আলোচনা মূলধারায় উঠে এলেই হিন্দু-মুসলমান সংক্রান্ত বয়ান এসে হঠাৎই মানুষের সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নেয়।”
নেহা আরও বলেছিলেন, “আমার মনে হয়, এই আন্দোলনগুলি দেখিয়ে দিয়েছে যে দেশের তরুণ প্রজন্ম বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর কাছ থেকে কী চায় না। আমার মনে হয়, এই আন্দোলন আমাদের সবাইকে যে শিক্ষা দিয়েছে, তা শুধু এই উপলব্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় যে, ফ্যাসিবাদীদের কাছ থেকেও জবাবদিহি আদায় করা সম্ভব।”
“সেই কারণেই অনশন থেকে ফিরে যখন আমি মাইকে কথা বলছিলাম, তখন আমি বলেছিলাম যে তরুণদের এই অনুভূতিটা মনে রাখা উচিত। একে অপরের বিরুদ্ধে নয়, বরং একে অপরের জন্য লড়াই করার অনুভূতি।”
বিজেপি-সমর্থক পরিবারে নেহার রাজনৈতিক অবস্থান
নেহা বোরা এমন একটি পরিবারে জন্মেছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপি-সমর্থক। নিজের পরিবারের রাজনৈতিক অবস্থানের কথা বলতে গিয়ে তিনি ওই সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমার নিজের পরিবারেই বিজেপির কট্টর সমর্থক রয়েছেন এবং আমাদের বাড়িতে এ নিয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য ছিল। আমি যখন থেকে দিল্লিতে এসেছি এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়েছি, তখন থেকেই বাড়িতে এই মতপার্থক্য চলছে।”
তিনি আরও বলেছিলেন, “অনেক সময় পরিস্থিতি খুবই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে আমার মনে হয়, আর্থিক বিষয় এবং নিজের জীবনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমি যথেষ্ট স্বাধীন ছিলাম এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পেরেছি। স্নাতক পড়াশোনার দ্বিতীয় বা তৃতীয় বর্ষ থেকেই আমি এই স্বাধীনতা পেয়েছিলাম, কারণ সেটাই ছিল আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।”
‘একে অপরের জন্য লড়লে পরিবর্তন আনা সম্ভব’
নেহা বোরার মতে, সিজেপি আন্দোলনের গুরুত্ব শুধু ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়। তার বিশ্বাস, তরুণ প্রজন্ম এই আন্দোলন থেকে শিখেছে যে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বদলে একে অপরের জন্য লড়লে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
যন্তর-মন্তর আন্দোলন থেকে তৈরি হওয়া শক্তি ও উদ্দীপনা এসআইআর, নির্বাচনক্ষেত্র পুনর্নির্ধারণ (ডিলিমিটেশন), শ্রমিকদের অধিকার এবং নারীদের সংরক্ষণের মতো অন্যান্য আন্দোলনেও ছড়িয়ে পড়ুক—এমনটাই চান তিনি।
তার কাছে এই আন্দোলন গণতন্ত্র এবং দেশের গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো রক্ষার বৃহত্তর সংগ্রামের অংশ।
সিজেপির নিট আন্দোলন থেকে নেহার উপলব্ধি
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যন্তর-মন্তরের আন্দোলন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নেহা বলেন, এই আন্দোলনকে কোনো নির্দিষ্ট খোপ বা শ্রেণিতে ফেলা যায় না। তার মতে, এটিই সময়ে অনেকেই বলেছেন, বহু প্রতিবাদী ছাত্রদের মায়েরা তাদের প্রতিবাদে যোগ দিতে উৎসাহিত করেছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন, তারা স্কুলে যাননি, কারণ তারা আন্দোলনে অংশ নিতে চেয়েছিলেন।েহা জানান, আন্দোলনের সময়ে বিজেপি-সমর্থক বাবা-মা এবং বয়স্ক ব্যক্তিরাও তার কাছে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আন্দোলনটির সবচেয়ে বড় শক্তি এবং তিনি চান এই বৈশিষ্ট্য অটুট থাকুক।
তিনি জানান, “যন্তর-মন্তরের আন্দোলনের সময়ে অনেকেই বলেছেন, বহু প্রতিবাদী ছাত্রদের মায়েরা তাদের প্রতিবাদে যোগ দিতে উৎসাহিত করেছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন, তারা স্কুলে যাননি, কারণ তারা আন্দোলনে অংশ নিতে চেয়েছিলেন।”
তার মতে, “এটি একটি পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত, ঘৃণার রাজনীতির দিকে ঠেলে দেওয়া একটা দেশে মানুষ একে অপরের হাত ধরতে শিখেছে।”
নেহা জানান, আন্দোলনের সময়ে বিজেপি-সমর্থক বাবা-মা এবং বয়স্ক ব্যক্তিরাও তার কাছে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং ছাত্রদের পরিস্থিতির জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন।
ফ্রন্টলাইনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের পরিবারের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, তার বিজেপিাজিক মাধ্যমে গত কয়েক দিন ধরে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে নেহা বোরার তুলনা করে কে বেশি ‘ম্যাচিউর’—এ-সমর্থক মা পুলিশি পদক্ষেপ নিজের চোখে দেখার পর আন্দোলনকারীদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছিলেন।
নেহার মতে, এ ধরনের মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তনই আন্দোলনটিকে আরও বিস্তৃত সামাজিক প্রভাব সৃষ্টি করতে সাহায্য করেছে।
অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে তুলনা নিয়ে বিতর্ক
সামাজিক মাধ্যমে গত কয়েক দিন ধরে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে নেহা বোরার তুলনা করে কে বেশি ‘ম্যাচিউর’—এ নিয়ে আলোচনা চলছে।
এক্সে অ্যামক নামের এক ইউজার নেহা বোরার ছবি পোস্ট করে লিখেছিলেন, “ম্যাচিউরিটি হলো, যখন আপনি বুঝতে পারবেন যে নেহা বোরা অভিজিৎ দীপকের চেয়ে বেশি প্রতিভাবান। তিনি জেন-জি এক বিক্ষোভে বক্তব্য দিতে গিয়ে নেহা বোরা নিজেও বলেছিলেন, মি. দীপক বিনয়ী, অন্যদের পরামর্শ গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকেন প্রজন্মের একেবারে আইকন, আর তার স্টাইল ও ব্যক্তিত্ব দুর্দান্ত।”
পোস্টটি পুনরায় শেয়ার করে অভিজিৎ দীপক নিজেই লিখেছিলেন, “আমি এর সঙ্গে একমত।”
এর কিছুক্ষণ পর নেহা এক্সে লিখেছিলেন, “তুলনা নয়, সংহতি। আমরা একসঙ্গে লড়ি।”
এর জবাবে অভিজিৎ লিখেছিলেন, “ইনকিলাব জিন্দাবাদ।”
সিজেপির আন্দোলনের সময় যন্তর-মন্তরের এক বিক্ষোভে বক্তব্য দিতে গিয়ে নেহা বোরা নিজেও বলেছিলেন, মি. দীপক বিনয়ী, অন্যদের পরামর্শ গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকেন এবং তিনি আন্দোলনকারীদের এই উপলব্ধি করিয়েছেন যে, তিনিও তাদের মতোই এই সংগ্রামের একজন ছাত্র ও সহযোদ্ধা।
সূত্র: বিবিসি
পড়ুন : ১৬ হাজার ২০৭ কোটি টাকায় একনেকে ১৩ প্রকল্প অনুমোদন
সা/


