শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম। তিনি বলেছেন, পূজামণ্ডপে বিশৃঙ্খলা, উসকানি, মাদক, ইভটিজিং, নারী ও শিশু হয়রানি কিংবা দুষ্কৃতিকারীদের তৎপরতা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে গুজব ছড়ানোর আগেই তা শনাক্ত ও প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সক্রিয় থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় সাভার উপজেলা পরিষদ হলরুমে শারদীয় দুর্গাপূজা-২০২৬ উপলক্ষে সাভার উপজেলার পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও সার্বিক প্রস্তুতি বিষয়ক সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন (বাবু)। সভায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জাবের মোঃ সোয়াইব, সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ সাইফুল ইসলাম, সাভার ও আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা, পূজা উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জানানো হয়, এবার সাভার উপজেলায় মোট ২৩৮টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে সাভার পৌরসভা এলাকায় ৪৫টি, শিমুলিয়া ইউনিয়নে ৪০টি, ধামসোনা ইউনিয়নে ১৩টি, আশুলিয়া ইউনিয়নে ১১টি, ইয়ারপুর ইউনিয়নে ১০টি, পাথালিয়া ইউনিয়নে ৩০টি, বিরুলিয়া ইউনিয়নে ১৪টি, সাভার ইউনিয়নে ৩টি, বনগাঁও ইউনিয়নে ১২টি, তেতুলঝোড়া ইউনিয়নে ২৬টি, কাউন্দিয়া ইউনিয়নে ১২টি এবং ভাকুর্তা ইউনিয়নে ২২টি পূজামণ্ডপ রয়েছে। আমিনবাজার ইউনিয়নে এবার কোনো পূজামণ্ডপ নেই।
ডিসি ফরিদা খানম বলেন, পূজামণ্ডপে প্রতিমা নির্মাণের সময় থেকে শুরু করে পূজা উদযাপন ও প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ মণ্ডপগুলোতে বিশেষ নজরদারি, পুলিশ-আনসার-সিআরবি/এসআরবি ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বিত দায়িত্ব পালন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপগুলোতে আইপি ক্যামেরা স্থাপন, ভিডিও ধারণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী রিচার্জেবল আইপি ক্যামেরা স্থাপন করে সেগুলো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট থানার সঙ্গে সংযুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচয়পত্র ও বাহুবন্ধনী নিশ্চিত করার পাশাপাশি পর্যাপ্ত সংখ্যক নারী স্বেচ্ছাসেবক রাখার নির্দেশ দেন তিনি।
পূজামণ্ডপে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, উসকানি, মাদক, ইভটিজিং, নারী ও শিশু হয়রানি কিংবা দুষ্কৃতিকারীদের তৎপরতার বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতিতে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক। পূজা উদযাপন কমিটির সদস্যদের যোগাযোগ নম্বর প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সংরক্ষণ এবং তাৎক্ষণিক যোগাযোগের জন্য হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ সক্রিয় রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ফায়ার সেফটির বিষয়ে ডিসি বলেন, প্রতিটি মণ্ডপে কমপক্ষে ৫ কেজি ধারণক্ষমতার অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, চার্জার লাইট ও প্রয়োজন অনুযায়ী জেনারেটর রাখতে হবে। বৈদ্যুতিক সংযোগে কোনো ধরনের ত্রুটি রাখা যাবে না। পূজা শুরুর আগেই ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ বিভাগের মাধ্যমে মণ্ডপগুলোর বৈদ্যুতিক ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শনের নির্দেশ দেন তিনি।
প্রতিমা বিসর্জনের জন্য নির্ধারিত স্থান ব্যবহারের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, বিসর্জনস্থলে ফায়ার সার্ভিস, নৌপুলিশ ও ডুবুরি দল প্রস্তুত রাখতে হবে। আলোকসজ্জা, পরিচ্ছন্নতা, যানবাহন চলাচল ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিসর্জন কার্যক্রম শেষ করতে হবে।
গুজব প্রতিরোধের বিষয়ে ডিসি ফরিদা বলেন, কোনো তথ্য যাচাই না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা যাবে না। কোনো গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে গুজবের উৎস শনাক্ত করে তা ছড়িয়ে পড়ার আগেই প্রতিরোধ করতে হবে। ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের উদ্দেশ্যে কেউ অপতৎপরতা চালালে দ্রুত আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেন তিনি।
তিনি বলেন, “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”— এই চেতনাকে ধারণ করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। আজান ও নামাজের সময় পূজামণ্ডপে মাইক বা বাদ্যযন্ত্রের শব্দ নিয়ন্ত্রণ এবং অন্য ধর্মের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানান তিনি।
ডেঙ্গু ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়েও সতর্ক করে তিনি বলেন, পূজামণ্ডপ ও আশপাশে কোথাও পানি জমতে দেওয়া যাবে না। পূজা শেষে দ্রুত বর্জ্য অপসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে পূজামণ্ডপ ঘিরে কোনো ধরনের মেলা, মাদক, জুয়া, হাউজি কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলতে দেওয়া হবে না।
ডিসি জানান, পূজার নিরাপত্তা প্রস্তুতি শুধু পূজার দিন থেকে নয়, মহালয়া থেকেই শুরু করতে হবে। আগামী ১০ অক্টোবর সকাল ৫টা থেকে মহালয়া উপলক্ষে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিমা বিসর্জনের পর পূজামণ্ডপ, মন্দির বা আশপাশের কোনো স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন না করার বিষয়েও তিনি নির্দেশনা দেন।
সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম বা অনুপ্রবেশের কোনো সুযোগ দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি পূজা উদযাপন কমিটিগুলোকে প্রশাসনের সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো ঘটনা ঘটার পর নয়, সম্ভাব্য কোনো সমস্যা বা ঝুঁকির আশঙ্কা দেখা দিলেই প্রশাসনকে জানাতে হবে।
ডিসি ফরিদা খানম বলেন, দুর্গাপূজার নিরাপত্তা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের নিরাপত্তা নয়; এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সামাজিক দায়িত্বশীলতারও পরীক্ষা। ঢাকা জেলা প্রশাসন পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা, নির্বিঘ্ন চলাচল এবং শান্তিপূর্ণভাবে ধর্মীয় আচার পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবে।
তিনি সাভারের সব পূজামণ্ডপে সমন্বিত প্রস্তুতি, সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও সম্প্রীতিময় দুর্গাপূজা উদযাপনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
পড়ুন : ১৬ হাজার ২০৭ কোটি টাকায় একনেকে ১৩ প্রকল্প অনুমোদন


