নানা অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অবশেষে নেত্রকোনার দুর্গাপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ফারুক আহমেদ তালুকদারকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কেন তাকে পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে না- তা জানতে চেয়ে বিধি মোতাবেক কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) জারি করেছে কলেজ পরিচালনা পর্ষদ।
বুধবার (৪ অক্টোবর) দুপুরে স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অ্যাডভোকেট এম এ জিন্নাহ্।
গভর্নিং বডি সূত্রে জানা গেছে, পরিচালনা পর্ষদের জরুরি সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভায় অধ্যক্ষ ফারুক আহমেদ তালুকদারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে তার কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতে সাময়িক অব্যাহতির সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক গৌতম কুমার মল্লিককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।
অধ্যক্ষকে অব্যাহতির সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে দুর্গাপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজে গত কয়েকদিন ধরে চলা অচলাবস্থার অবসান ঘটেছে। সাবেক এই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা পাহাড়সম অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থার দাবিতে গত প্রায় পাঁচ দিন ধরে কর্মবিরতি পালন করে আসছিলেন কলেজের শিক্ষকরা। গভর্নিং বডির কঠোর ও ত্বরিত সিদ্ধান্তের পর শিক্ষকরা তাদের কর্মবিরতি সাময়িকভাবে স্থগিতের ঘোষণা দেন। ফলে আজ থেকে কলেজে পুনরায় নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে ক্লাসে ফিরতে পারায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে ব্যাপক স্বস্তি ফিরে এসেছে।
স্থায়ী বহিষ্কারের দাবি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় সচেতন মহলের প্রতিনিধিরা গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শিক্ষা নিয়ে কোনো ধরনের টালবাহানা আমরা আর দেখতে চাই না। সন্তানদের জন্য সুষ্ঠু শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ আমাদের কাম্য।”
তারা আরও জানান, ফারুক আহমেদ তালুকদারের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে শুধু সাময়িক অব্যাহতি নয়, তাকে চিরতরে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করতে হবে। পাশাপাশি কলেজের শিক্ষার মান ও স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে নবনিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে প্রয়োজনীয় ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানান তাঁরা।
এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজ পরিচালনা পর্ষদের এক সদস্য অভিযুক্ত অধ্যক্ষের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, সাবেক অধ্যক্ষ ফারুক আহমেদের নানা দুর্নীতির বিষয়ে বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) তদন্ত চলমান রয়েছে।
ওই সদস্য অভিযোগ করে বলেন, “তিনি (ফারুক আহমেদ) সরকারি কোষাগার থেকে বেতন তোলেন মহিলা কলেজ থেকে, অথচ সময় দেন ও কাজ করেন তার বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত মফিজ উদ্দিন তালুকদার কলেজের হয়ে। দুর্গাপুর মহিলা কলেজকে অচল করে রাখার জন্য তিনি প্রতিনিয়ত নানা পাঁয়তারা করে আসছিলেন। তার বিরুদ্ধে একগুচ্ছ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গভর্নিং বডির হাতে এসেছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে ঐতিহ্যবাহী এই কলেজটি পরিচালিত হোক। সেই লক্ষ্যেই পরিচালনা পর্ষদের সবাই মিলে একমত হয়ে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
অধ্যক্ষ ফারুক আহমেদ তালুকদারের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগগুলোর বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন প্রতিবেদক। তবে তার ফোনটি বন্ধ থাকায় কোনো মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অব্যাহতির ঘটনার মধ্য দিয়ে দুর্গাপুরের শিক্ষা প্রশাসনে জবাবদিহিতার একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো। এখন সবার নজর গভর্নিং বডির পরবর্তী পদক্ষেপ এবং প্রশাসনিক তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফলের দিকে।
পড়ুন : সুবর্ণচরে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অবৈধ ইটভাটা, দুই লাখ টাকা জরিমানা


