পুলিশ বাহিনীতে সক্রিয় হচ্ছে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠরা?

পুলিশের ভেতরে কি হঠাৎ করেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ একটি অংশ? তা না হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেন বলবেন -পুলিশের কেউ কেউ এখনো ‘ফ্যাসিবাদী শক্তির’ সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, দিচ্ছেন তথ্য, শৃঙ্খলা ভাঙলে হতে পারে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাও।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই যোগাযোগ কি শুধু তথ্য দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ, নাকি তার ছায়া পড়ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও?

পুলিশের পোশাক এক, ব্যাজ এক, শপথও রাষ্ট্রের নামে। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য বলছে -সবার যোগাযোগের ঠিকানা হয়তো এক নয়। তিনি জানিয়েছেন, পুলিশের কিছু সদস্য এখনো নিষিদ্ধ রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, তথ্য দিচ্ছেন। দায়িত্বে অবহেলা কিংবা এমন সহযোগিতার অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থার কথাও বলেছেন তিনি।

আর এমন বক্তব্য এসেছে এমন সময়ে, যখন ছোট একটি আওয়ামী লীগ মিছিলও পুলিশের বড় কর্মকর্তাদের চেয়ার কাঁপিয়ে দিচ্ছে। ফলে পুলিশের নতুন ভয় হয়তো এমন -অপরাধী পালালেও ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে, কিন্তু দশ-পনেরো জন মিছিল করে ফেললে চেয়ারটাই চলে যাবে।

ডিএমপির শীর্ষ পর্যায় থেকেও বলা হয়েছে, কোনো এলাকায় আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল হলে সংশ্লিষ্ট ওসি ও ডিসিকে দায় নিতে হবে। তাই প্রশ্ন উঠছে -থানার পুলিশ এখন কোনটা আগে সামলাবে? পাড়ার চাঁদাবাজ? জমি-ফ্ল্যাট দখলের অভিযোগ? ছিনতাই-সন্ত্রাস? নাকি গলির মাথায় দশজন কখন ‘জয় বাংলা’ বলে দাঁড়িয়ে যায়, সেই পাহারা?

পুলিশের ভেতরের কোনো অংশ সত্যিই যদি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক শক্তিকে তথ্য দেয়, দায়িত্ব পালনে নিষ্ক্রিয় থাকে কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবস্থাকে দুর্বল করে -তাহলে সেটি শুধু রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রশ্ন নয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তারও প্রশ্ন। তবে প্রতিটি ব্যর্থতার পেছনেই ‘আওয়ামী লীগপন্থী পুলিশ’ -এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না প্রমাণ ছাড়া।

তাই হিসাবটা খুব সোজা -পুলিশের কাজ দল পাহারা দেওয়া নয়, জনগনের নিরাপত্তা আর আইন পাহারা দেওয়া। কিন্তু একদিকে ভেতরের রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগ, অন্যদিকে বদলি-সদরদপ্তরের ভয় -এই দুইয়ের মাঝখানে যদি পুলিশ নিজের চেয়ার বাঁচাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের ঘর, জমি আর জীবন পাহারা দেবে কে?

ইউনিফর্মের ভেতরে রাজনীতি যত বাড়বে, আইনের জন্য জায়গা ততই ছোট হবে। অথচ পুলিশের সামনে যেন এখন দুই পরীক্ষা। একদিকে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের ঝটিকা মিছিল ঠেকানো, অন্যদিকে নাগরিকের বাড়ি, দোকান, জমি, ব্যবসা আর জীবন পাহারা দেওয়া।

প্রথমটিতে ব্যর্থ হলে বদলি দৃশ্যমান। দ্বিতীয়টিতে ব্যর্থ হলে ক্ষতিটা বহন করেন সাধারণ মানুষ। আর এখানেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নতুন কৌতুহল তৈরি করছে। যদি সত্যিই পুলিশের কিছু সদস্য নিষিদ্ধ রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখেন, তথ্য দেন -তাহলে তাঁরা শুধু শৃঙ্খলা ভাঙছেন না, পুরো বাহিনীর কার্যক্রমকেই ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছেন।

আবার উল্টো প্রশ্নও আছে -প্রতিটি ব্যর্থতাকে ‘আওয়ামী লীগপন্থী পুলিশ’-এর ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে কি প্রকৃত প্রশাসনিক দুর্বলতা, গোয়েন্দা ব্যর্থতা আর অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি আড়াল হয়ে যাবে? মনে হয় না।

ডিএমপির নির্দেশনাতেও বলা হয়েছে, কেবল অতীতে কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বা সমর্থনের কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না, প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ। তাই পুলিশে- কে আওয়ামী লীগ, কে বিএনপি -তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত, কে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছেন কে আইন মানছে আর কে ভাঙছেন।

রাষ্ট্রের পুলিশ যদি সারাক্ষণ নিজের চেয়ার বাঁচানোর মিছিলে ব্যস্ত থাকে, তবে নাগরিকের দরজায় কড়া নাড়া অপরাধীকে ঠেকাবে কে? আর পুলিশের ভেতরে সত্যিই যদি রাজনৈতিক আনুগত্য রাষ্ট্রের আনুগত্যকে হারিয়ে দেয় -তাহলে বদলি আর ক্লোজ দিয়ে শুধু চেয়ার বদলাবে, সংকট বদলাবে না।

অনেকেই বলছেন, পুলিশ ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছে। কিন্তু দুই বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলে সেই ফেরাটাকে আর কতদিন ‘ধীরে’ বলা যায়?

আইনের পোশাক যদি মানুষের ভয়ে সংকুচিত হয়, তবে অপরাধীর সাহসই বাড়ে। পুলিশের কাজ জনগণকে আতঙ্কিত করা নয়, তবে আইনের প্রতি এমন আস্থা ও দৃঢ়তা তৈরি করা -যাতে অপরাধী আইনকে ভয় পায়, আর সাধারণ মানুষ পুলিশের উপস্থিতিতে নিরাপদ বোধ করে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : ক্ষমতার আয়নায় ভাঙা চেহারা: বদলে গেল প্রভাবশালীদের জীবন


দেখুন : https://www.youtube.com/watch?v=pzwPK_0ebNM&t=21s

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন