একদিকে বেকারত্ব, অন্যদিকে কম আয়ে সংসার চালানোর কঠিন বাস্তবতা। জীবিকার তাগিদে তাই অটোরিকশার স্টিয়ারিং হাতে তুলে নিচ্ছেন নানা পেশার মানুষ। ব্যবসায়ী, দিনমজুর, ভ্যানচালক কিংবা বেকার—পেশাগত দক্ষতা না থাকলেও তুলনামূলক সহজে শেখা যায় এবং দিন শেষে নগদ আয় করা যায়, এমন ধারণা থেকেই অনেকে ঢুকছেন এই পেশায়।
কিন্তু জীবিকার এই সহজ পথের অন্য প্রান্তে তৈরি হচ্ছে আরেক সংকট। বেপরোয়া গতির অটোরিকশার ধাক্কায় প্রতিদিন আহত হচ্ছেন নানা বয়সী মানুষ। কারও শরীরের অঙ্গহানি হচ্ছে, কেউ দীর্ঘদিন হাসপাতালে পড়ে থাকছেন। আবার কোনো কোনো দুর্ঘটনায় শুধু একজন মানুষ নয়, থমকে যাচ্ছে পুরো পরিবারের আয়-রোজগার।
পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি একসময় ঢাকায় ভ্যানে করে মাছ বিক্রি করতেন। ব্যবসা মন্দা যাওয়ায় এখন তিনি অটোরিকশা চালান। এই পেশায় আসার আগে তাঁর কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না, এমনকি অটোরিকশা চালানোর অভিজ্ঞতাও ছিল না।
পেশা পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, “অটো চালাতে আবার অভিজ্ঞতা লাগে নাকি? দুই-তিনটি টিউনিং দিলেই অটো চালানো যায়। এটি কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই চালানো যায়। আমি প্রশিক্ষণ ছাড়াই এটি চালাতে শিখেছি। এটা আমার পেশা নয়, ঠেকায় পড়ে আমি অটো চালাচ্ছি।”
কম খরচে অটোরিকশা তৈরি করা যায় এবং প্রতিদিন হাতে নগদ আয় আসে—এই দুই কারণও নতুন চালকদের আকৃষ্ট করছে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৬০ হাজার টাকা খরচে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা তৈরি করা সম্ভব। দিন শেষে আয় হতে পারে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত। ফলে পুরোনো পেশায় আয় কমে গেলে অনেকে অটোরিকশাকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।
অন্য পেশা ছেড়ে অটোরিকশা চালানো কয়েকজন জানান, আগে অফিসার ক্লাবে ডেকোরেটরের লাইনে পাতিল ধুতেন। সেখান থেকে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াইশ টাকা আয় হতো। ওই আয়ে সংসার চালানো সম্ভব ছিল না। পরিবার নিয়ে স্বস্তিতে থাকার সুযোগও ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে এখন অটোরিকশা চালাচ্ছেন তারা।
তাদের ভাষ্য, “তেলের সমস্যা, গ্যাসের সমস্যা—সব মিলিয়ে এখন আর তেমন আয় করতে পারেন না। তারাও এখন আমাদের মতো অটোরিকশা চালান। আমিও আগে প্রাইভেটকারের ড্রাইভার ছিলাম। দেশে জমিজমা করছি। সার, পানির দাম বেড়ে গেছে। এখন আমরা কী করব, বলেন?”
রাজধানীর বিভিন্ন অটোরিকশার গ্যারেজে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নতুন চালকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো রিকশা ব্যবসায়ীরাও চাপের মধ্যে পড়েছেন। তাদের ভাষ্য, লাভ এবং প্রতিদিনের নগদ আয়ের আশায় এখন অনেকেই অটোরিকশার ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন।
রিকশা ব্যবসায়ীদের একজন বলেন, “মাত্র ২ লাখ ৩৯ হাজার দিয়ে কি এমনভাবে চলতে পারে? বর্তমানে তো ১০ থেকে ১২ লাখ অটো চলছে। বিভিন্ন মালিক এগুলো তৈরি করেছেন। মূলত যারা রিকশার মালিক, তারাই অটো বানাননি। এই যে ব্যাটারি, এসব সেট, মালামাল তো বাইরে থেকে আমদানি হয়ে দেশে এসেছে। অবশ্যই কোনো না কোনো মন্ত্রী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েই এসব মালামাল দেশে আনা হয়েছে। নাহলে তো এগুলো আমদানি করা সম্ভব হতো না। এসব মালামাল যদি বাংলাদেশে ঢোকার অনুমতি পেয়ে থাকে, তাহলে এগুলো দিয়ে অটো চালানোর অনুমতিও অবশ্যই সরকারের দেয়া কর্তব্য।”
চালকদের দাবি, সরকারি ফি দিয়ে দুই সিটি করপোরেশনের ২ লাখ ৩৯ হাজার প্যাডেলচালিত রিকশার নিবন্ধন নম্বরও নবায়ন করা হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, অটোরিকশাকেও বৈধতার আওতায় এনে নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসবে সরকার।
জীবিকার তাগিদে অটোরিকশার সংখ্যা ও চালকের সংখ্যা বাড়লেও এর বেপরোয়া চলাচল নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। একটি অটোরিকশার কয়েক সেকেন্ডের নিয়ন্ত্রণহীন গতি বদলে দিতে পারে একটি পরিবারের পুরো জীবন। প্রতিদিনই ব্যাটারিচালিত এই যানের ধাক্কায় হাসপাতালে আসছেন নানা বয়সী মানুষ।
এমনই একজন ৭৬ বছর বয়সী রওশন আলী। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে স্বজনদের ভরসা হওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু বেপরোয়া অটোরিকশার ধাক্কায় এখন তিনিই অন্যের ওপর নির্ভরশীল। তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে কেটে ফেলতে হয়েছে ডান পা। চিকিৎসার পেছনে সঞ্চয়ের সবটুকু শেষ হয়ে গেলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি তিনি।
বয়সের ভারে নুইয়ে পড়লেও জীবনযুদ্ধে কখনো হার মানেননি রওশন আলী। কিন্তু সড়কে অটোরিকশার এক ধাক্কায় বদলে গেছে তাঁর পুরো জীবন। এখন কৃত্রিম পা কিংবা অন্যের সহায়তা ছাড়া সামনে এগোনোর পথও অনিশ্চিত।
রওশন আলী বলেন, “আমি একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলাম। আমার টাকা-পয়সা সব শেষ করে দিয়েছে। এখন আমি পথের ভিখারি। আপনারা দোয়া করে যদি অটোরিকশা বাতিল করেন, তাহলে মানুষ বাঁচবে।”
শুধু রওশন আলী নন, অটোরিকশার ধাক্কায় আহত হয়ে হাসপাতালে আসছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। কারও অঙ্গহানি হচ্ছে, কেউ আবার মাসের পর মাস বিছানায় পড়ে থাকছেন।
তীব্র ব্যথায় হাসপাতালের মেঝেতে কাতরাচ্ছে পাঁচ বছরের শিশু আবদুল্লাহ। কিছুক্ষণ আগেও যার হাতে ছিল খাবার কেনার টাকা, এখন সেই শিশুটিই চিকিৎসার অপেক্ষায়। রাস্তা পার হওয়ার সময় নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশার ধাক্কায় গুরুতর আহত হয় সে।
শিশুটির বাবা জানান, “বাচ্চাটা খাবার কেনার জন্য রাস্তার পাশের দোকানে নিয়ে যাচ্ছিলেন। পরে একটি অটোরিকশা এসে তাকে ধাক্কা দেয়।”
নতুন চাকরির খোঁজে সাভারের পথে বেরিয়েছিলেন মাসুদ। সামনে ছিল নতুন জীবনের স্বপ্ন। কিন্তু একটি দুর্ঘটনায় সেই পথ বদলে গিয়ে এখন হাসপাতালের চার দেয়ালের মধ্যে আটকে আছেন তিনি।
দুর্ঘটনার কথা স্মরণ করে মাসুদ বলেন, “একটি গাড়ি আসতে দেখে চালক সেটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। এরপর আমাকে খাম্বা ও দেয়ালের চিপায় নিয়ে চাপা দেয়। আজ পর্যন্ত ৫০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে। আমি ভালো চিকিৎসাও পাচ্ছি না।”
একটি দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের শরীরেই আঘাত করে না, এর প্রভাব গিয়ে পড়ে পুরো পরিবারের ওপর। হাসপাতালে পড়ে থাকা একজন রোগীর সঙ্গে থেমে যেতে পারে পরিবারের আয়-রোজগার। একদিকে বাড়তে থাকে চিকিৎসার ব্যয়, অন্যদিকে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে সংসারের ভবিষ্যৎ।
অন্যদিকে বেকারত্ব ও কম আয়ের চাপে নতুন নতুন মানুষ যখন অটোরিকশার স্টিয়ারিং হাতে তুলে নিচ্ছেন, তখন এই যানকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে জীবিকা ও নিরাপত্তার দুই বিপরীত বাস্তবতা। কারও কাছে অটোরিকশা সংসার চালানোর শেষ ভরসা, আবার কারও জীবনে এর বেপরোয়া চলাচল হয়ে উঠছে স্থায়ী দুর্ভোগের কারণ।
পড়ুন:
আর/


