জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) একজন নাগরিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইডেন্টিটি বা পরিচায়ক। অথচ অতি সংবেদনশীল এনআইডি তৈরির সার্ভারেই কি না ঢুকে পড়ল জালিয়াত চক্র! নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসে ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি তৈরির এমনই এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ইতোমধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে সচেতন মহলে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো- অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি সরকারি সার্ভারে তথ্য আপলোডের মতো কারিগরি প্রক্রিয়ায় কীভাবে বাইরের মানুষ বা একজন সাধারণ পরিচ্ছন্নতাকর্মী যুক্ত হলেন?
ঘটনার শিকড় খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসছে নানা কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য। মামলা, গ্রেপ্তার এবং পাল্টাপাল্টি দাবির ভিড়ে এখন খোঁজা হচ্ছে ঘটনার প্রকৃত মাস্টারমাইন্ড বা নেপথ্যের কারিগরদের।
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমানের দায়ের করা এজাহারে রংছাতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান পাঠান বাবুল, কথিত এক আবেদনকারীর পরিচয়দানকারী পিতা ওমর আলী এবং উপজেলা নির্বাচন অফিসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মঞ্জুরুল মিয়াসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার পর পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। কলমাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেল রানা গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- নেত্রকোনা সদর উপজেলার ধারিয়া গ্রামের আনিছ মিয়ার ছেলে ও নির্বাচন অফিসের চাকরিচ্যুত আউটসোর্সিং কর্মী কাঞ্চন মিয়া (২৯) এবং শেরপুর সদর উপজেলার দড়িপাড়া গ্রামের লাল মিয়ার ছেলে ও বর্তমান পরিচ্ছন্নতাকর্মী মঞ্জুরুল মিয়া। পুলিশ জানিয়েছে, পুরো বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
নির্বাচন অফিস-সংশ্লিষ্ট বিশ্বস্ত সূত্রের দেওয়া তথ্যমতে, জালিয়াতির মূল ঘটনাটি ঘটে গত ১১ আগস্ট রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে। ওই রাতে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসের আইডি ব্যবহার করে নূর হালিমা ও মুজিবুর রহমান নামের দুজনের ভুয়া কাগজপত্র সার্ভারে আপলোড করা হয়। সূত্রটি নিশ্চিত করেছে, ওই রাতে শুধু এই দুজনের তথ্যই সিস্টেমে প্রবেশ করানো হয়েছিল। এর মধ্যে মুজিবুর রহমানের ফাইল নম্বর (১২১১৫০৭৯১) এবং ঠিকানা হিসেবে রংছাতি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের নাম ব্যবহার করা হয়েছে।
এখন সমাজের নানা স্তরের মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন- গভীর রাতে অফিসের আইডি ব্যবহার করে তথ্য আপলোড করলেন কে? ওই আইডিতে কার কার প্রবেশাধিকার ছিল?
এজাহারে সবচেয়ে বেশি বিস্ময় তৈরি করেছে পরিচ্ছন্নতাকর্মী মঞ্জুরুল মিয়ার নাম। ঝাড়ু দেওয়া বা অফিস পরিষ্কার রাখার দায়িত্বে থাকা একজন কর্মী কীভাবে এনআইডি নিবন্ধনের মতো জটিল কারিগরি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হলেন, তা নিয়ে খোদ প্রশাসনের ভেতরেই কানাঘুষা চলছে। তিনি কি নিজেই তথ্য আপলোড করেছিলেন, নাকি তার অজ্ঞাতে অন্য কেউ তার পরিচয় ও অফিসের আইডি ব্যবহার করেছে- সেটি এখনো বড় রহস্য।
এরই মধ্যে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা তার অভিযোগে অফিসের সিসিটিভি নষ্ট থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন, যা এই রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে।
এজাহারে নাম থাকা রংছাতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান পাঠান বাবুল (যিনি উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমান সদস্য) শুরু থেকেই নিজের সম্পৃক্ততার কথা জোরালোভাবে অস্বীকার করে আসছেন।
নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে তিনি বলেন, “আমাদের ইউনিয়ন পরিষদের ওয়েবসাইটে এসব ভুয়া তথ্যের কোনো অস্তিত্ব নেই। একটি চক্র হয়তো বাইরে থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে জন্মনিবন্ধন ও নাগরিকত্ব সনদ তৈরি করে এই অপকর্ম করেছে।”
তার এই বক্তব্যের পর তদন্তের মোড় কিছুটা ভিন্ন দিকেও যেতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সনদগুলো আসলেও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেওয়া হয়েছিল, নাকি বাইরে থেকে হুবহু নকল করা হয়েছে- তা এখন ডিজিটাল ফরেনসিক প্রমাণের অপেক্ষায়। একইসঙ্গে নূর হালিমার পিতা দাবি করা ওমর আলীর প্রকৃত পরিচয় ও ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মামলার নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, গত ২০ জুলাই নির্বাচন অফিসের তিনজন আউটসোর্সিং কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়। অন্যদিকে, মামলার বাদী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান কলমাকান্দায় যোগ দেন চলতি বছরের ২ মার্চ। তার যোগদানের আগের সময়ের কিছু ভোটার নিবন্ধন নিয়েও তদন্ত চলছিল বলে জানা গেছে। চাকরিচ্যুতি এবং আগের তদন্তের সঙ্গে বর্তমান জালিয়াতির কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও পুলিশের তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
এ ধরনের ঘটনায় সাধারণত চুনোপুঁটিরা ধরা পড়লেও রাঘববোয়ালরা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। তবে প্রযুক্তি এখন অনেক উন্নত। সার্ভার লগ বিশ্লেষণ, ব্যবহারকারীর ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট, দায়িত্ব বণ্টনের অফিশিয়াল নথি এবং সিসিটিভির হার্ডডিস্ক পরীক্ষা করলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসা সম্ভব।
কারও নাম এজাহারে থাকা মানেই তিনি অপরাধী নন, আবার কেউ ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেই তিনি নির্দোষ নন। সমাজের সকল স্তরের মানুষের একটাই প্রত্যাশা- একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে এনআইডি জালিয়াতির চক্রের আসল রূপটি জনসমক্ষে উন্মোচিত হোক। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই দুর্ভেদ্য দেয়ালের ছিদ্রগুলো দ্রুত বন্ধ করা প্রয়োজন।
পড়ুন : শিমলা পার্কের সুরক্ষা নিশ্চিতসহ পাখির আবাসস্থল রক্ষার দাবি


