ভোরের আলো ফুটতেই গ্রামের উঠোনে যে চঞ্চল পায়ের ছাপ পড়ত, সেই মেঠোপথ আজ পুরোপুরি নিস্তব্ধ। যে বয়সে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বেড়ে ওঠার স্বপ্ন দেখার কথা, সেই শৈশবেই মৃত্যুর ওপারেও হয়ে রইল দুই সহোদর। সাত বছরের বড় ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের ছয় বছরের নিষ্পাপ প্রাণটি বিলিয়ে দিল ছোট ভাই।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার পাইকুড়া ইউনিয়নের নিভৃত পল্লী কাওয়ালীকান্দা গ্রামে রবিবার (১১ অক্টোবর) হৃদয়বিদারক এ ঘটনায় আব্দুস সাত্তারের দুই সন্তান মুয়াজ (৭) ও আরাফাত (৬)- বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। মুহূর্তের অসতর্কতায় সাজানো পরিবারের আলো চিরতরে নিভে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সকালের স্নিগ্ধ রোদে বাড়ির আঙিনায় আপন মনে খেলায় মেতেছিল দুই ভাই মুয়াজ ও আরাফাত। শৈশবের সেই চঞ্চল মুহূর্তেই ঘটে চরম বিপত্তি। অসাবধানতাবশত জীবন্ত বৈদ্যুতিক তার স্পর্শ করে ফেলে মুয়াজ। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ছটফট করতে থাকা বড় ভাইকে দেখে বোঝার বাকি ছিল না বিপদের গভীরতা; কিন্তু শিশু আরাফাতের রক্তে তখন কেবলই ভাইয়ের টান। ভাইকে বাঁচানোর তাগিদে সে এক মুহূর্তও দ্বিধা করেনি। নিজের ক্ষুদ্র দুই হাত বাড়িয়ে ভাইকে আঁকড়ে ধরতে যেতেই অদৃশ্য ঘাতক বিদ্যুৎ এক নিমেষেই কেড়ে নেয় আরাফাতকেও।
ঘটনার সময় শিশুদের বাবা আব্দুস সাত্তার ও মা পাশের গোয়ালঘরে সংসারের নিত্যকাজে ব্যস্ত ছিলেন- গাভির দুধ দোয়ানোর কাজ করছিলেন তারা। হঠাৎ উঠোন থেকে ভেসে আসে সন্তানদের বুকফাটা চিৎকার। কাজ ফেলে আতঙ্কিত চিত্তে ছুটে আসেন মা-বাবা। চোখের সামনে দুই সন্তানকে নিথর হয়ে পড়ে থাকতে দেখে তাদের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে যায়।
চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা ছুটে এসে দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে অচেতন দুই শিশুকে উদ্ধার করেন। দ্রুততার সঙ্গে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জানান, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছে দুই ভাই। চিকিৎসকের এমন ঘোষণায় স্তব্ধ হয়ে যায় হাসপাতালের পরিবেশ।
একসঙ্গে দুই সন্তানকে হারিয়ে বাবা-মা এখন বাক্রুদ্ধ, শোকে যেন পাথর হয়ে গেছেন। মা কিছুক্ষণ পর পর মূর্ছা যাচ্ছেন, আর উঠোনে দাঁড়িয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছেন বাবা- যে উঠোনে কিছুক্ষণ আগেও খেলা করছিল তার কলিজার টুকরো দুটি ধন। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে কাওয়ালীকান্দার বাতাস। খবর ছড়িয়ে পড়তেই আশপাশের গ্রাম থেকেও শত শত মানুষ ছুটে আসছেন মর্মান্তিক পরিণতি দেখতে; চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না কেউই।
কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও বেদনাদায়ক। অবুঝ দুই শিশুর এমন চলে যাওয়া মেনে নেওয়া কঠিন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”
একদিকে ভাইপ্রেমের বিরল অথচ করুণ আত্মত্যাগ, অন্যদিকে অসতর্ক বিদ্যুতায়নের ভয়াল পরিণতি- কাওয়ালীকান্দা গ্রামের ট্র্যাজেডি আজ শুধু একটি পরিবারকেই নয়, কাঁদিয়ে গেল গোটা এলাকার সর্বস্তরের মানুষকে।
পড়ুন : বাংলাদেশ সময় রাত ৩টা পর্যন্ত রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা
সা/


