ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর ভয়াবহ হামলার মুখে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ সময় রাত ৩টা পর্যন্ত বিমানবন্দরটির সার্বিক কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) রাতে বিমানবন্দরে এই নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটে। এতে বিমানবন্দরে কর্মরত ও অবস্থানরত ১২ জন নিহত হন, যার মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক, দুজন বাংলাদেশি এবং মার্কিন, মিশরীয়, জর্ডানীয়, সিরীয়, ফিলিস্তিনি ও সুদানি নাগরিক রয়েছেন একজন করে। এ ঘটনায় আরও অন্তত ৩০৯ জন আহত হয়েছেন, যাদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক এবং তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া হামলায় সম্পদেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে এক বিবৃতিতে তথ্য জানিয়েছে দেশটির জেনারেল অথরিটি অব সিভিল এভিয়েশন (জিএসিএ)।
রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতিদের এই ধারাবাহিক হামলার কারণে বাংলাদেশ থেকেও সৌদিগামী ফ্লাইট উড্ডয়ন বাতিল করা হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা গেছে, শনিবার থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত ঢাকা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, সৌদিয়া এবং রিয়াদ এয়ারের মোট ৫টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এমনকি শনিবার ঢাকা থেকে রিয়াদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট রিয়াদের উদ্ভূত পরিস্থিতি দেখে মাঝপথেই ওমানের মাস্কাট বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে এবং পরবর্তীতে ঢাকায় ফিরে আসে।
ইয়েমেনে হুতির বিরুদ্ধে লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট এই বেসামরিক টার্মিনালে হামলাকে ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাপরাধ’ আখ্যা দিয়ে হুতিদের দায়ী করেছে। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি কঠোর বার্তা দিয়ে বলেন, “প্রচলিত আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী এই সন্ত্রাসী হামলার জবাব দৃঢ়ভাবে দেয়া হবে।” তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আরও নিশ্চিত করেন যে, দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশেও একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় কিং খালিদ বিমানবন্দরে হুতিদের হামলার কঠোর নিন্দা প্রকাশ করেছেন।
উল্লেখ্য, প্রায় দুই মাস ধরে সৌদি সামরিক জোট ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে তীব্র হামলা-পাল্টা হামলা চলছে, যেখানে রিয়াদ বিমানবন্দরকে মূল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে তারা। গত এক সপ্তাহে কেবল এই বিমানবন্দরটিতেই অন্তত চারবার হামলা চালিয়েছে হুতিরা। এর আগে গত বৃহস্পতিবার অবকাঠামোর পাশাপাশি সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের একটি বিমানকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলে এক পাইলট সহ ৩ জন সৌদি নাগরিক প্রাণ হারান। হুতিদের আগে থেকেই হুশিয়ারি ছিল যে, কোনো বিমানসংস্থা সৌদির আকাশসীমা ব্যবহার করলে কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে; যার ধারাবাহিকতায় শনিবার রাতে এই বড় ধরণের বিপর্যয় সৃষ্টি হলো।
এদিকে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় দুই বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার. রোববার (১১ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই নিন্দা জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, গত ১০ অক্টোবরের ওই ভয়াবহ হামলায় ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে দুই জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও অনেকে গুরুতর আহত হয়েছেন; যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক. এই মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে নিহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা ও আন্তরিক শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার এবং একই সঙ্গে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করা হয়েছে।
নিহত ও আহত বাংলাদেশিদের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য রিয়াদের বাংলাদেশ মিশন বর্তমানে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, বেসামরিক মানুষের জীবন বিপন্ন করা এবং কোনো ধরনের বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, ফলে এই ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে. বর্তমান এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সৌদি আরব সরকার ও সে দেশের জনগণের প্রতি নিজেদের দৃঢ় সংহতি পুনর্ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি চলমান সংঘাত নিরসনে অবিলম্বে শত্রুতা পরিহার, সাধারণ নাগরিক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে একমাত্র সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমেই সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জোরালো আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।
পড়ুন : রিয়াদ বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় বাংলাদেশিসহ নিহত ১২
সা/


