সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ও তীব্র হামলা অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা ও আনাদোলু সূত্রে জানা গেছে, দেশটির একাধিক বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় সম্প্রতি এসব ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।
কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাণ্ডব ও হতাহত:
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে এক পাকিস্তানি নাগরিক নিহত এবং অন্তত ১১ জন আহত হয়েছেন। দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (জিএসিএ) নিশ্চিত করেছে যে, গত রোববার (১১ অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাতে অভ্যন্তরীন ফ্লাইটের জন্য নির্দিষ্ট ৩ ও ৪ নম্বর টার্মিনালে এই হামলার ঘটনা ঘটে। আহতদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ঐ সময় বিমানবন্দরে ট্যাক্সিওয়েতে অবস্থানরত একটি উড়োজাহাজের এক যাত্রী বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, রোববার রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে বেশ কয়েকটি পার্ক করা বিমানের পাশেই রানওয়েতে ক্ষেপণাস্ত্রটি আঘাত হানে। পরবর্তীতে তাদের উড়োজাহাজটি গেটে ফিরিয়ে এনে যাত্রীদের নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর আগের দিন শনিবারেও (১০ অক্টোবর) একই বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় ১২ জন নিহত এবং ৩ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছিলেন। সৌদি আরবে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, শনিবারের হামলায় গুরুতর আহত এক ভারতীয় নাগরিক রোববার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। ফলে ঐ একক হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ জনে। এছাড়া গত বৃহস্পতিবার হুথিদের পৃথক হামলায় এক পাইলটসহ অন্তত ৩ জন সৌদি নাগরিক প্রাণ হারান। সব মিলিয়ে গত পাঁচ দিনে কেবল রিয়াদ বিমানবন্দরই চারবার হামলার শিকার হলো।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষভাগে ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল সংঘাত শুরুর পর শনিবারে রিয়াদ বিমানবন্দরে সংঘটিত হামলাটিই ছিল সৌদির মাটিতে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা। এই হামলার পর থেকেই বিমানবন্দরটির স্বাভাবিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
দাম্মাম বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় জোড়া হামলা:
রাজধানী রিয়াদের পাশাপাশি সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হামলা চালানো হয়েছে। জিএসিএ জানিয়েছে, তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কাজ করছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে এই হামলায় কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির স্পষ্ট চিত্র জানা যায়নি। বেসামরিক বিমান চলাচলকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক আক্রমণের অংশ হিসেবেই এই আঘাত হানা হয়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
অন্যদিকে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় দাবি করেছে, পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাহায্যে তারা একটি ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে।
হুতিদের দায় স্বীকার ও হুমকি:
ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এক টেলিভিশন বার্তায় কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, তাদের হামলাটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে এবং সেখানে বিমান চলাচল ব্যাহত করতে পেরেছে।
একই সাথে তিনি রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়াও সৌদি খনিজ তেল কোম্পানি আরামকোর পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের ‘শেডগাম গ্যাস প্ল্যান্ট’ এবং ‘তানাজিব তেল স্থাপনায়’ সমন্বিত হামলা চালানোর দাবি করেন। ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলার উপযুক্ত জবাব হিসেবেই এই সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে জানিয়ে ভবিষ্যতে সৌদি আরবে আরও বড় ধরনের হামলার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
বাড়তে থাকা যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি:
পর পর বিমানবন্দরগুলোতে এই ধরনের হামলায় ইয়েমেন সংঘাত এখন চরম আকার ধারণ করেছে। একই সাথে এই আঞ্চলিক যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সরাসরি যুক্ত হওয়ার ঝুঁকিও জোরালো হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের যোগ দেওয়ার বিষয়টি বর্তমানে তার সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে।
পড়ুন : সৌদির রিয়াদে বিমানবন্দরে হামলায় ২৪ বাংলাদেশি আহত
সা/


