দাম বাড়ানোর পরও চাহিদামতো মিলছে না এলপিজির বাজার

আমদানি পর্যাপ্ত হলেও পাইকারি পর্যায়ে মিলছে না চাহিদামতো সিলিন্ডার। সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিয়ম, কার্গো আসতে বিলম্ব ও কৃত্রিম সংকটের অভিযোগের মধ্যে তদারকি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিজ্ঞাপন

দাম সমন্বয়ের মাধ্যমে আমদানি বাড়ানো এবং সরবরাহ স্বাভাবিক করার আশ্বাস দেওয়া হলেও এখনো স্বাভাবিক হয়নি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজার। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আমদানিকারকদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির আশ্বাস দিয়েছিল। তবে অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহেও পাইকারি পর্যায়ে চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন ব্যবসায়ীরা।

পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি, আমদানিকারক পর্যায়ে ট্রাক আটকে থাকায় এলপিজি সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে। তিন থেকে চার দিন অপেক্ষার পর ট্রাক এলেও চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। এতে একদিকে যেমন খুচরা বাজারে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বেড়ে ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, ১২ কেজির ১৪৭টি সিলিন্ডার পেতে তিন দিন পর্যন্ত সময় লাগছে। পাইকারি পর্যায়ে পণ্য পৌঁছানোর পর খুচরা দোকানিরা ভাগে মাত্র পাঁচ থেকে সাতটি সিলিন্ডার পাচ্ছেন। তাঁদের অভিযোগ, একটি ট্রাক পাঠানোর পর চার থেকে পাঁচ দিন পর্যন্ত সেটিকে প্ল্যান্টে অপেক্ষা করতে হয়। তিন দিন আগে ট্রাক পাঠিয়েও কখন পণ্য পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারছেন না তাঁরা।

এ পরিস্থিতিতে এলপিজি সরবরাহব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত আমদানির কথা বলা হলেও সরবরাহের বিভিন্ন ধাপে কেন ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাইছেন পরিবেশক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা।

লোয়াবের দাবি, চলতি মাসে দেশে দেড় লাখ টনের বেশি এলপিজি আমদানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, যা দেশের চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট। তবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি দামের কারণে আমদানি ও পরিবহনে বেশি সময় লাগছে। সংগঠনটির মতে, এ পরিস্থিতিকে বড় ধরনের বাজার সংকট হিসেবে দেখার কারণ নেই।

লোয়াবের সহসভাপতি হুমায়ুন রশীদ জানান, সমন্বয়ের মাধ্যমে চলতি মাসে বাজারে এলপিজির সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কোথাও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটবে না বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

তিনি বলেন, প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার টন এলপিজি আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ চলছে। আমদানির ক্ষেত্রে একাধিক ক্রয়ব্যবস্থা থাকলেও স্পট মার্কেট থেকে কেনা কার্গো নির্ধারিত সময়ে না পৌঁছানোর ঘটনা ঘটছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, একটি কার্গো ১০ তারিখে আসার কথা থাকলেও সেটি এসেছে ১৫ তারিখে। পাঁচ দিনের এ বিলম্বে ট্রাকগুলো প্ল্যান্টে আটকে থাকে। ফলে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে বলে ব্যবসায়ীদের ধারণা তৈরি হয়। তাঁর অভিযোগ, এ পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী।

তবে লোয়াবের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয় পরিবেশকদের সংগঠন এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। সংগঠনটির দাবি, আমদানি পর্যাপ্ত থাকলে বাজারে পণ্য সরবরাহে বাধা থাকার কথা নয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) মধ্যস্থতায় আমদানিকারকদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চায় তারা।

সংগঠনটির অর্থ সম্পাদক আবু তাহের কোরেশী বলেন, বিইআরসির পক্ষ থেকে গত ছয় মাসের অনুপাত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় গ্যাস আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলা এবং গ্যাস দেশে আসার কথা জানানো হয়েছে। কোম্পানিগুলোও পর্যাপ্ত গ্যাস থাকার দাবি করছে। তাহলে পরিবেশক ও ব্যবসায়ীরা কেন চাহিদামতো পণ্য পাচ্ছেন না, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।

কোরেশীর মতে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে বসে সরবরাহব্যবস্থার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। আমদানিকারকদের কাছে পর্যাপ্ত মজুত থাকলে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, শুধু এলপিজির দাম ঘোষণা বা সমন্বয় করলেই বাজার স্থিতিশীল হবে না। আমদানি, খালাস, প্ল্যান্টে মজুত, পরিবহন ও পরিবেশক পর্যায়ে সরবরাহ—প্রতিটি ধাপে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বিইআরসিকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে কি না, তা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং অবৈধভাবে মজুত গড়ে তোলার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সরকারের রয়েছে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, এলপিজির বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ব্যবস্থাপনায় এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, আমদানির পরিমাণের পাশাপাশি সরবরাহের স্বচ্ছতা, মজুতের হিসাব এবং পরিবেশক পর্যায়ে পণ্য পৌঁছানোর বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা গেলে বাজারের প্রকৃত সংকট চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

সব মিলিয়ে, পর্যাপ্ত আমদানির আশ্বাস এবং বাস্তব বাজার পরিস্থিতির মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করা, কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই এখন এলপিজি বাজার স্থিতিশীল করার প্রধান চ্যালেঞ্জ।

পড়ুন:সৌদির রিয়াদে বিমানবন্দরে হামলায় ২৪ বাংলা‌দে‌শি আহত

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন