‘মারামারির চ্যালেঞ্জ’ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা, ফেসবুক ভিডিওতে সুর বদল চেয়ারম্যান রোমার

সংসদ সদস্যকে সরাসরি মারামারির চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন ঢাকার ধামরাই উপজেলার সূতিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রমিজুর রহমান চৌধুরী রোমা। সেই বক্তব্যের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার ফেসবুকে ভিডিও বার্তা দিয়ে নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি। সংসদ সদস্যের সঙ্গে এমন আচরণ করা ঠিক হয়নি উল্লেখ করে তাঁকে ক্ষমা করে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন রোমা। তাঁর এই ভিডিও বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুরের পর নিজের ফেসবুক আইডিতে ভিডিও বার্তাটি প্রকাশ করেন রমিজুর রহমান রোমা। এতে তিনি বলেন, গত ৩ অক্টোবর তাঁর গ্রামে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, যা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা তিনি ও তাঁর নেতাকর্মীরা কল্পনাও করেননি। ওই ঘটনায় দিশেহারা ও হতাশাগ্রস্ত হয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি অনেক কথা বলেছেন, যা ঠিক হয়নি বলে স্বীকার করেন রোমা।

তিনি বলেন, আমার ভুল হয়েছে। আমার অনেক ভুল আছে, আমি স্বীকার করি। এমপির সঙ্গে এভাবে কথা বলা আমার ঠিক হয়নি। এমপি সাহেবের সঙ্গে দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছি বলে ভিডিও বার্তায় সংসদ সদস্য তমিজ উদ্দিনের সঙ্গে নিজের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন রোমা। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা দীর্ঘদিনের। ২০১৭ সালে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সময় তমিজ উদ্দিনই তাঁকে ওই প্রতীক দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। এ জন্য সংসদ সদস্যের প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন রোমা।

তিনি আরও বলেন, এমপি সাহেবের বিরুদ্ধে এভাবে কথা বলা মোটেও উচিত হয়নি। আমি দীর্ঘদিন তাঁর সঙ্গে রাজনীতি করেছি। তিনি আমাকে ভালোভাবেই চেনেন। আসলে রাজনীতির প্রতি এখন আমার ঘৃণা চলে এসেছে। রাজনীতি করার আর ইচ্ছা নেই। সাম্প্রতিক ঘটনার কারণে তাঁর নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন উল্লেখ করে রোমা বলেন, সংসদ সদস্য তমিজ উদ্দিন ধামরাইয়ের সবার অভিভাবক। এ কথা তিনি নিজেও স্বীকার করেন। সংসদ সদস্য তাঁকে নিজের সন্তানের মতো দেখেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

রোমা বলেন, বাবার কাছে সন্তান ভুল করতেই পারে। আমি ভুল করেছি, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাই। আশা করি, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আমার বা আমার নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার দিকে এগোবেন না এটাই আমার অনুরোধ। ক্ষমা না করলে পুলিশ পাঠিয়ে গ্রেপ্তার করিয়ে দিয়েন।

ভিডিও বার্তায় সংসদ সদস্যকে ‘চাচা’ সম্বোধন করে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন রোমা। সংসদ সদস্যকে নিজের রাজনৈতিক গুরু উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁকে তিনি সব সময় চাচা বলে ডাকেন এবং তাঁর কাছ থেকে সন্তানের মতো ভালোবাসা পেয়েছেন।

রোমা বলেন, আপনি আমার রাজনৈতিক গুরু ছিলেন। আপনাকেই আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতাম। ভুল করলে আপনার কাছেই করেছি। আপনি দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আমার নেতাকর্মীদেরও এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করবেন।

নিজের অসুস্থ মাকে দেখতে পরদিন বাড়িতে যাওয়ার কথা জানিয়ে রোমা বলেন, তাঁর মা খুবই অসুস্থ। এ কারণে তাঁকে বাড়িতে যেতেই হবে। সংসদ সদস্য তাঁকে ক্ষমা না করলে প্রশাসনের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করতে পারেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রোমা বলেন, আপনি যদি আমাকে ক্ষমা করেন, তাহলে আলহামদুলিল্লাহ। আর যদি মনে করেন, প্রশাসনের মাধ্যমে আমাকে শাস্তি দেবেন, তাহলে পুলিশ পাঠিয়ে দিয়েন, সরাসরি ধরে নিয়ে যাবে আমাকে। আমি আগামীকাল সকাল ৮টায় বাড়িতে আসব। আমার মা অসুস্থ, আমাকে আসতেই হবে। বিষয়টি বিবেচনা করে আমাকে সন্তানের মতো ক্ষমা করে দেবেন।

সংঘর্ষ, মামলা ও রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে

চেয়ারম্যান রোমার এই ক্ষমা প্রার্থনা এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন স্থানীয় সংসদ সদস্য তমিজ উদ্দিনের সঙ্গে তাঁর বিরোধ, অনুসারীদের সংঘর্ষের ঘটনা এবং রাজনৈতিক বিতর্ককে কেন্দ্র করে ধামরাইয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

সম্প্রতি ধামরাইয়ে বিএনপির এক বিক্ষোভ মিছিলের পর রোমা ও এমপির সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। ঘটনার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় সংসদ সদস্যকে সরাসরি মারামারির চ্যালেঞ্জ জানান রোমা। তাঁর সেই বক্তব্য ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

এরপর সংসদ সদস্য তমিজ উদ্দিনের সংবাদ সম্মেলন এবং বিক্ষোভ মিছিলে হামলার অভিযোগে দায়ের করা মামলা ঘিরে দুই পক্ষের বিরোধ আরও প্রকাশ্যে আসে। রোমার বক্তব্যের প্রতিবাদে উপজেলা বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা তাঁকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। তাঁর চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণ ও দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন এবং স্মারকলিপি দেওয়ার মতো কর্মসূচিও পালন করা হয়।

মামলার ঘটনায় একজন আসামি গ্রেপ্তার হওয়ার পর রোমাসহ তাঁর অনুসারীরা আত্মগোপনে রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এমন সময়ে ক্ষমা চেয়ে চেয়ারম্যান রোমার ভিডিও বার্তা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তাঁর ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ কেউ তাঁর আগের বক্তব্য, পরবর্তী রাজনৈতিক বিরোধ এবং চলমান মামলার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন।

সংসদ সদস্যকে প্রকাশ্যে মারামারির চ্যালেঞ্জ জানানোর পর রাজনৈতিক চাপ ও বিতর্কের মধ্যে চেয়ারম্যান রোমার এই ক্ষমা প্রার্থনা স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে তাঁর ভিডিও বার্তা প্রকাশের পর সংসদ সদস্য তমিজ উদ্দিনের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া এসেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পড়ুন : শ্রীপুরে ভুয়া বিলে খাদ্য গুদাম কর্মকর্তার অর্থ আত্মসাৎ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন