বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে সরকার গৃহীত নানা নীতি ও কর্মসূচির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ও একাত্মতা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ব্যাংককে বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী জানান, দায়িত্ব নেওয়ার সময়েই বর্তমান সরকার এক চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। পূর্ববর্তী আমলের বিভিন্ন দায় ও বোঝার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে, তা বিশ্বব্যাংক ভালোভাবে অনুধাবন করতে পেরেছে। ফলে সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার যেসব নীতি গ্রহণ করেছে, সংস্থাটি তার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের গৃহীত নীতি এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কর্মসূচি ও গতিপথের বিষয়ে বিশ্বব্যাংক গভীরভাবে আগ্রহী। অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের অবস্থানের সুস্পষ্ট সামঞ্জস্য রয়েছে। কীভাবে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়ে উভয় পক্ষ একসাথে কাজ করছে। এ ছাড়া সংস্থাটির সঙ্গে অংশীদারত্বের কাঠামো (পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক) কেমন হবে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই একটি লিখিত প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে।
গণমাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা চাওয়ার বিষয়ে ছড়িয়ে পড়া খবরের বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা একটি নিয়মিত ও চলমান প্রক্রিয়া এবং এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ভুল তথ্যের বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমে অনেক বিভ্রান্তিকর তথ্য দেখা যাচ্ছে। মূলত ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এই আলোচনার ভিত্তিতে পরবর্তীতে ঢাকায় আরও পর্যালোচনা ও ফলোআপ অনুষ্ঠিত হবে। এ প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। এটিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে ভবিষ্যতের কাজের ভিত্তি হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি। তবে আলোচনার সার্বিক অগ্রগতিতে অর্থমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
একই সময়ে বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং আইএমএফের প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতিসংক্রান্ত বৈচিত্র্যময় পূর্বাভাস সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার কোনো সংস্থার হিসাব বা প্রক্ষেপণকে বিতর্কিত করতে চায় না। তারা নিজেদের গাণিতিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এই হিসাব দিয়েছে। সরকারের মূল লক্ষ্য হলো সহযোগিতা অব্যাহত রেখে বাজেটে নির্ধারিত অর্থনৈতিক প্রক্ষেপণ ও লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা।
আইএমএফের পূর্বাভাস ও আন্তর্জাতিক অর্থসংক্রান্ত সেশনের চিত্র:
অন্যদিকে, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভা চলাকালীন সকালে প্রকাশিত আইএমএফের সর্বশেষ ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক (ডব্লিউইও)’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.২ শতাংশে নেমে আসতে পারে (যা গত এপ্রিলে ৪.৩ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছিল)। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
একই বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ৩.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও (এডিবি) প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগের ইঙ্গিত দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বৈঠক করে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সহায়তা চেয়েছেন।
এ ছাড়া আইএমএফের বার্ষিক সভার অংশ হিসেবে ‘বিশ্ব অর্থনীতির সম্ভাবনা ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক একটি সাইড ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। এতে আইএমএফের গবেষণা বিভাগের পরিচালক সিলভিনা টেনরেইরোসহ চারজন গবেষক উপস্থিত ছিলেন। সেশনে জানানো হয়, বিশ্ব অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রও পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়; বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ৩.১ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩.৪ শতাংশ হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে খাদ্য ও জ্বালানির ঊর্ধ্বমূল্য বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিকে কিছু সহায়তা দিচ্ছে। আইএমএফ জোর দিয়ে বলেছে, বর্তমান ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারি অর্থব্যবস্থার সক্ষমতা উদ্ধার, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
পড়ুন : নিউইয়র্কে বিমানবন্দরে ড. ইউনূসকে কটূক্তির ঘটনায় আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি তথ্য উপদেষ্টার
সা/


