চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) টানা ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর উদ্ধার হওয়া নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সেখানে তাঁকে ২৪ ঘণ্টার নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং সুচিকিৎসায় গঠন করা হয়েছে বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড। প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে বুধবার (১৪ অক্টোবর) বোর্ডের পক্ষ থেকে তাঁর শারীরিক পরিস্থিতির সর্বশেষ আপডেট দেওয়ার কথা রয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর মুঠোফোনে নিজের শারীরিক পরিস্থিতি ও চলমান বিষয়ে কথা বলেন উপাচার্য।
অবরুদ্ধ থাকার সময়কার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম বলেন ‘আপনারা ইতোমধ্যে অবগত হয়েছেন, আমরা অমানবিক একটা পরিবেশে ছিলাম। এর প্রেক্ষিতে আমাদের ১১ জনের স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটে। অনেকে অসুস্থ হয়ে যান। আমাদের দুজন অ্যালামনাই সদস্য গত রাতে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাদের একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।’
বিদ্যুৎহীন অবস্থায় কষ্টের কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, গত সোমবার দুপুর ১২টা থেকে বিদ্যুৎ বন্ধ থাকায় আমাদের অমানবিক কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে একপর্যায়ে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। সরকারি চিকিৎসক ও সিভিল সার্জনের পরামর্শক্রমে আমাকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।
সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে তিনি জানান, সরকার থেকে তাঁর প্রতি পূর্ণ সহযোগিতা রয়েছে এবং দ্রুত সুস্থ হয়ে ক্যাম্পাসে ফিরে দায়িত্ব পালনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদে ছড়িয়ে পড়া পদত্যাগ কিংবা ভবিষ্যতে ক্যাম্পাসে না ফেরার গুঞ্জনকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন উপাচার্য। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আমি পদত্যাগ করেছি এবং ভবিষ্যতে চুয়েট ক্যাম্পাসে পদার্পণ করব না, এ রকম কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি আমি দিইনি। আপনারা দেখেছেন, যখন আমাকে নিয়ে আসা হচ্ছিল, তখন আমার কথা বলার মতো পরিস্থিতি ছিল না। যারা এ রকম সংবাদ প্রচার করছেন, তাদের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে, আপনারা সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচার করবেন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে উপাচার্য আহ্বান জানিয়ে বলেন “তোমরা তোমাদের অমূল্য শিক্ষাজীবন নষ্ট করো না। তোমরা হয়ত কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর পাল্লায় পড়ে ব্যবহৃত হচ্ছ। তোমরা যথেষ্ট বুদ্ধিমান। তোমরা কারও দ্বারা ব্যবহৃত হবে না, এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস।”
নিজের দায়িত্ব গ্রহণের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে তিনি উল্লেখ করেন “রাষ্ট্র আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে, সেই অর্পিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতেই চট্টগ্রামে এসেছি। কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে বা কোনো দলীয় অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে আসিনি।”
ক্যাম্পাসের ঘটনা ও উদ্ধারের পটভূমি
চুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনঃবহালের দাবিতে গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ক্যাম্পাসে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, মাস্ক মিছিল ও চোখ বেঁধে প্রতিবাদসহ নানা কর্মসূচি চালিয়ে আসছিলেন শিক্ষার্থীরা। এই অচলাবস্থার মাঝেই গত সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল পৌনে ৯টার দিকে বহিরাগতদের সহায়তায় প্রশাসনিক ভবনের তালা ভেঙে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম কার্যালয়ে প্রবেশ করলে নতুন করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
শিক্ষার্থীরা দুপুর ১২টার মধ্যে তাঁকে কার্যালয় ছাড়ার আলটিমেটাম দেন। তিনি সরে না দাঁড়ালে দুপুর সাড় ১২টায় ভবনে পুনরায় তালা ঝুলিয়ে উপাচার্যকে নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়। ঘটনার জেরে চুয়েট শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন যৌথভাবে সর্বাত্মক অসহযোগ ও কর্মবিরতির ঘোষণা দিলে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।
টানা ৩০ ঘণ্টা এই অচলাবস্থা চলার পর মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম সরাসরি ক্যাম্পাসে যান।
তৎক্ষণাৎ গণমাধ্যমকে জেলা প্রশাসক বলেন “একজন সম্মানিত শিক্ষক আমাদের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছেন, চিকিৎসার জন্য বলেছেন। তাকে আমরা নিয়ে যেতে এসেছি। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হবে।”
পরবর্তীতে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে উপাচার্যকে ভবন থেকে নামিয়ে আনা হয়। ওই সময় উপস্থিত আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষে মাইকে ঘোষণা দিয়ে বলা হয়— ‘ভিসিকে আমরা ক্যাম্পাস থেকে বের হতে দিচ্ছি একটি মাত্র শর্তে, সেটি হলো তিনি আর চুয়েট ক্যাম্পাসে ফিরবেন না।’ শিক্ষার্থীরা ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেওয়ার মধ্য দিয়েই পুলিশি পাহারায় একটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে উপাচার্যকে হাসপাতালে পাঠায় জেলা প্রশাসন।
পড়ুন : ১০ বছরের সাজার রায়ের বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে ইনুর আপিল
সা/


