আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে নতুন ঋণ সহায়তা নিতে হলে সংস্থাটির নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, আইএমএফের সঙ্গে নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং বিষয়টি ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। তবে ঋণের আওতায় কী ধরনের শর্ত থাকবে এবং সেগুলো কীভাবে পূরণ করা হবে, তা নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন। কিছু বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ব্যাংককে আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। বৈঠকে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, কর-জিডিপি অনুপাত, ব্যাংকের পুনঃমূলধনীকরণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। ঋণ সহায়তা পেতে হলে কিছু শর্ত থাকবে এবং সেগুলো পূরণ করতে হবে। তবে সব বিষয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে। যেসব বিষয়ে দুই পক্ষের মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলো নিয়েও আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি এবং রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, ব্যাংকের পুনঃমূলধনীকরণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ রয়েছে।
বাংলাদেশও এসব বিষয়ে আইএমএফের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত বলে জানান তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো সমাধানে ইতোমধ্যে বেশ কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে কিছু বিষয় এখনো বাকি রয়েছে। সেগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা চলছে।
অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা এবং রাজস্ব আয় বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে এবং অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করবে।
কর-জিডিপি অনুপাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় কর থেকে সরকারের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ কত, তা এই অনুপাতের মাধ্যমে বোঝানো হয়। এ অনুপাত বাড়ানো গেলে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং বিভিন্ন জরুরি খাতে অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়তে পারে।
বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আইএমএফের প্রশ্ন রয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশেরও কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে। ব্যাংকিং খাত ও কর-জিডিপি অনুপাতসহ বিভিন্ন বিষয়ে আইএমএফের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে বাংলাদেশ একমত। এসব ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে অনেক অগ্রগতি হয়েছে এবং বাকি বিষয়গুলো নিয়েও কাজ চলছে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হলেও ঋণ সহায়তার শর্ত চূড়ান্ত করার আগে আরও আলোচনা প্রয়োজন। অর্থাৎ, ঋণ পাওয়ার বিষয়টি শুধু আলোচনা শুরু হওয়ার ওপর নির্ভর করছে না; বরং সংশ্লিষ্ট শর্ত, সংস্কার বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং দুই পক্ষের সমঝোতার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আইএমএফ সাধারণত ঋণ কর্মসূচির আওতায় সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতার মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এসব বিষয়ে অগ্রগতি নতুন কর্মসূচির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে নতুন কর্মসূচির নির্দিষ্ট শর্ত ও ঋণের পরিমাণ সম্পর্কে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে আইএমএফ সন্তুষ্ট বলেও জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বাজেট-পরবর্তী অগ্রগতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসহ বৈশ্বিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে সংস্থাটি সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামের ওঠানামা এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাতের প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশ যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা নিয়ে আইএমএফ ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। তবে অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করা প্রয়োজন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, শুধু আইএমএফ নয়, বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গেও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করবে বাংলাদেশ। দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে এসব সংস্থার সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে চলমান আলোচনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঋণ সহায়তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে শর্ত নির্ধারণ, সংস্কার বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং পারস্পরিক সমঝোতার বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করতে হবে।
সব মিলিয়ে, আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোলেও ঋণ পেতে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো এ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, যেসব বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে, সেগুলোকে ভিত্তি করে বাকি বিষয়গুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে। দুই পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে শর্ত চূড়ান্ত হলে নতুন কর্মসূচির পরবর্তী ধাপ নির্ধারিত হবে।
পড়ুন:খোলাবাজারের সয়াবিন তেলে ক্ষতিকর ভারী ধাতু মেলেনি: শিল্পমন্ত্রী
ইমি/


