অপরাধ দমন ও তদন্তের কাজে ক্রমেই বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার। হাজারো সিসিটিভি ফুটেজ, ফোন রেকর্ড, আর্থিক লেনদেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য এবং পুরোনো অপরাধের নথি বিশ্লেষণ করে অপরাধের ধরন ও সম্ভাব্য যোগসূত্র শনাক্ত করতে সহায়তা করছে এআই। এতে তদন্তের সময় কমানোর পাশাপাশি অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো এবং সন্দেহজনক কার্যক্রম চিহ্নিত করার নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে এ প্রযুক্তির নির্ভুলতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপুল পরিমাণ তথ্য মানুষের পক্ষে অল্প সময়ে বিশ্লেষণ করা কঠিন। কিন্তু মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি এসব তথ্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সম্পর্ক ও পুনরাবৃত্তির ধরন দ্রুত শনাক্ত করতে পারে। ফলে তদন্তকারীরা বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে সম্ভাব্য যোগসূত্র খুঁজে বের করতে এবং তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে সহায়তা পান।
যুক্তরাষ্ট্রের সান্তা ক্রুজ পুলিশ বিভাগ ঐতিহাসিক অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য অপরাধপ্রবণ এলাকা শনাক্ত করতে প্রেডিক্টিভ সিস্টেম ব্যবহার করেছে। এ ধরনের প্রযুক্তি অতীতের অপরাধের ধরন, সময় ও স্থান বিশ্লেষণ করে কোথায় আবার অপরাধ ঘটার ঝুঁকি বেশি হতে পারে, সে বিষয়ে ধারণা দেয়।
এআই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত পূর্বাভাস দেয় না। বরং অতীতের তথ্য থেকে সম্ভাব্য প্রবণতা শনাক্ত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক হতে সাহায্য করে। তবে এ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করে তথ্যের মান, বিশ্লেষণ পদ্ধতি এবং বাস্তবে কীভাবে ফলাফল ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর।
অপরাধ তদন্তে এআইয়ের অন্যতম বড় শক্তি হলো ডেটা অ্যানালিটিকস। একজন তদন্তকারীকে শত শত নথি পরীক্ষা করতে হলেও এআই অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে। একই ফোন নম্বর, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, আইপি ঠিকানা, অবস্থান কিংবা আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে একাধিক ঘটনার সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা শনাক্ত করতে এ প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে।
এতে জটিল অপরাধের নেটওয়ার্ক, অর্থের গতিপথ এবং বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে সম্ভাব্য যোগাযোগের সূত্র খুঁজে পাওয়া সহজ হতে পারে। তবে এআইয়ের বিশ্লেষণকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। তথ্যের ভুল, অসম্পূর্ণতা কিংবা অ্যালগরিদমের সীমাবদ্ধতার কারণে ভুল সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তাই এআই থেকে পাওয়া সূত্র যাচাই করে তদন্তকারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
অপরাধের ধরনও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। বর্তমানে অনলাইনে চুরি করা পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, হাতিয়ে নেওয়া লগইন পরিচিতি এবং আপসকৃত কম্পিউটার ব্যবস্থার অপব্যবহার করে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। অপরাধমূলক পরিষেবা কেনাবেচার মাধ্যমে অপরাধীদের জন্য সাইবার হামলা চালানোও সহজ হতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ইউরোপল সতর্ক করেছে, এআই অপরাধীদের সক্ষমতা বাড়াতে এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পরিসর বিস্তৃত করতে পারে। প্রতারণামূলক বার্তা তৈরি, ভুয়া পরিচয় ব্যবহার এবং মানুষের বিশ্বাস অর্জনের কৌশল আরও উন্নত করতে এ প্রযুক্তির অপব্যবহার সম্ভব।
ফলে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হচ্ছে। শুধু প্রচলিত তদন্তপদ্ধতি নয়, ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিগত প্রমাণ যাচাইয়ের দক্ষতাও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অপরাধ দমনে এআইয়ের ব্যবহার বাড়লেও এর সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাত তৈরি হওয়া এবং ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে প্রেডিক্টিভ প্রযুক্তির ফলাফলকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হলে নিরপরাধ ব্যক্তি অযথা নজরদারির শিকার হতে পারেন।
এ কারণে এআইয়ের দেওয়া তথ্য যাচাই করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে মানুষের তদারকি বজায় রাখা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার নীতিমালা অনুসরণ করা প্রয়োজন। প্রযুক্তির ব্যবহার যেন তদন্তকে সহায়তা করে, কিন্তু যথাযথ প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ার বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
সব মিলিয়ে, অপরাধ দমনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তদন্তের গতি ও তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে অপরাধীরাও প্রযুক্তির অপব্যবহার করে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। ফলে অপরাধ মোকাবিলার লড়াই ক্রমেই হয়ে উঠছে প্রযুক্তিনির্ভর। এই পরিস্থিতিতে এআইয়ের কার্যকর ব্যবহার, মানবিক তদারকি এবং শক্তিশালী আইনি কাঠামোর সমন্বয়ই অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পড়ুন:সিটিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে টানা দ্বিতীয় জয় পিএসজির
ইমি/


