ঘরের মাঠে খেলার প্রথমার্ধেই পরপর তিন গোল হজম করে চরম বিপাকে পড়েছিল ম্যানচেস্টার সিটি। বিরতির পর নরওয়েজীয় স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড জোড়া গোল করে দলকে লড়াইয়ে ফেরানোর চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত আর রক্ষা হয়নি। দেজিরে দুয়ে ও উসমান দেম্বেলেদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের সুবাদে ইংলিশ ক্লাবটিকে ৪-২ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে টানা দ্বিতীয় জয় তুলে নিল ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেইন্ট জার্মেই (পিএসজি)।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাতে ইতিহাদ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নস লিগের লিগ পর্বের এই ম্যাচে পিএসজির পক্ষে একটি করে গোল করেছেন দেজিরে দুয়ে, উসমান দেম্বেলে, ভিতিনিয়া ও ম্যানিয়েস আকলিউশ। অন্যদিকে, পরাজিত দল সিটির হয়ে দুটি গোলই আদায় করেন ইনফর্ম স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড। আর এই ম্যাচেই ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোল করার নতুন রেকর্ড নিজের নামের পাশে লিখে নিয়েছেন তিনি।
ম্যাচের প্রথমার্ধের চিত্র ও পিএসজির আধিপত্য:
খেলার শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছিল লুইস এনরিকের দল পিএসজি। ম্যাচের ১৩তম মিনিটে ফাবিয়ান রুইসের নিখুঁত পাস থেকে দারুণ এক শটে পিএসজিকে ১-০ গোলে এগিয়ে দেন তরুণ ফরোয়ার্ড দেজিরে দুয়ে। এর ঠিক দুই মিনিট পর ব্যবধান দ্বিগুণ করেন উসমান দেম্বেলে; এবার দুয়ের বাড়িয়ে দেওয়া বলে চমৎকার হেডে বল জালে পাঠান এই ফরাসি ফরোয়ার্ড।
একাধিক গোল হজম করার পর প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করেও সফল হতে পারেনি সিটি। উল্টো একের পর এক আক্রমণে স্বাগতিকদের রক্ষণভাগকে ব্যতিব্যস্ত রাখে পিএসজির আক্রমণভাগ। ৩২তম মিনিটে ম্যানিয়েস আকলিউশ ও ওয়ারেন জাইরে-এমেরির চমৎকার বোঝাপড়ায় তৈরি হওয়া আক্রমণে দলের তৃতীয় গোলটি আদায় করে নেন ভিতিনিয়া।
এর ফলে চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচে নিজেদের ঘরের মাঠে প্রথমার্ধেই তিন গোল হজম করার মতো এক বিব্রতকর অভিজ্ঞতার মুখে পড়ে ম্যানচেস্টার সিটি। অন্যদিকে, বিরতিতে যাওয়ার আগেই ম্যাচের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের মুঠোয় নিয়ে নেয় বর্তমান চ্যাম্পিয়ন পিএসজি।
দ্বিতীয়ার্ধে সিটির কামব্যাকের চেষ্টা ও হালান্ডের রেকর্ড:
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই দলগত পারফরম্যান্সে গতি আনতে একসঙ্গে তিনটি পরিবর্তন আনেন সিটি কোচ এনজো মারেস্কা। রায়ান শেরকি, জেরেমি ডোকু ও রুবেন দিয়াসকে উঠিয়ে মাঠে নামানো হয় মাতেউস নুনেস, আয়ুব বুয়াদ্দি ও ইলিমান এনদিয়ায়েকে। এই পরিবর্তনের সুবাদেই ম্যাচের গতি ফিরে পায় স্বাগতিকরা।
দ্বিতীয়ার্ধের ৫৩ মিনিটে ব্যবধান কমান আর্লিং হালান্ড। বাঁ প্রান্ত দিয়ে আক্রমণে ওঠা এনদিয়ায়ের নিখুঁত ক্রসে দারুণ এক হেডে পিএসজির গোলরক্ষক মাতভেই সাফোনভকে পরাস্ত করেন তিনি। আর এই গোলটির মাধ্যমেই সার্জিও আগুয়েরোর ৩৬ গোলের রেকর্ড ভেঙে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা বনে যান হালান্ড। সব মিলিয়ে টুর্নামেন্টে তার গোলসংখ্যা গিয়ে দাঁড়াল ৩৭টিতে।
গোল পাওয়ার পর আরও বেশি উজ্জীবিত হয়ে আক্রমণ শাণাতে থাকে সিটি। বেশ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও কাঙ্ক্ষিত ব্যবধান কমাতে ব্যর্থ হয় তারা। উল্টো ম্যাচের ৬৩ মিনিটে পিএসজির পক্ষে চতুর্থ গোলটি করেন আকলিউশ। উসমান দেম্বেলের পাস বক্সের বাইরে পেয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে দুর্দান্ত শট নেন এই ফরাসি মিডফিল্ডার। সিটি গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মা বল প্রতিহত করার শেষ চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত তা জালে জড়িয়ে যায়। ফলে আবারও তিন গোলের ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে স্বাগতিকরা।
শেষ মুহূর্তের লড়াই ও সাবেক কোচের উপস্থিতি:
বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়লেও লড়াই ছাড়েনি সিটি। ম্যাচের ৭০ মিনিটে ইয়োশকো গাভার্দিওলের নেওয়া হেড গোললাইন থেকে ক্লিয়ার করে দেন নুনো মেন্দেস। এর পরের মিনিটেই এনজো ফার্নান্দেজের দূরপাল্লার একটি বুলেট গতির শট সরাসরি পোস্ট ও ক্রসবারের সংযোগস্থলে লেগে ফিরে আসে।
অবশেষে ৭৫ মিনিটে আবারও গোলের দেখা পান হালান্ড। বদলি নামা বুয়াদ্দির পাস থেকে নিখুঁত নিচু শটে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করে ব্যবধান ৪-২ এ নামিয়ে আনেন তিনি। খেলার শেষদিকে ব্যবধান আরও কমানোর সুযোগ পেয়েছিল সিটি। কিন্তু ৮৩ মিনিটে হালান্ডের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে নিশ্চিত একটি গোল কেড়ে নেন পিএসজি গোলরক্ষক সাফোনভ।
অন্যদিকে, ম্যাচের ৮৭ মিনিটে পিএসজির নুনো মেন্দেসকে বক্সের ভেতর ফাউল করায় পেনাল্টি পায় ফরাসি ক্লাবটি। কিন্তু ৯০ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামা ফেরান তোরেসের নেওয়া স্পট কিক দারুণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন গোলরক্ষক দোন্নারুম্মা। এর ফলে সাবেক ক্লাবের বিপক্ষে আরও একটি গোল হজম করার হাত থেকে সিটিকে রক্ষা করেন এই ইতালিয়ান গোলরক্ষক। এরপর নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে আর কোনো গোলের দেখা না মিললে ৪-২ ব্যবধানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে পিএসজি।
এই জয়ে টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে পোর্তোকে ২-০ গোলে হারানোর পর দ্বিতীয় ম্যাচে এসে হারের স্বাদ পেল ম্যানচেস্টার সিটি। পক্ষান্তরে, নিজেদের প্রথম ম্যাচে স্লোভান ব্রাতিস্লাভাকে ৬-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে উড়িয়ে দেওয়ার পর শক্তিশালী সিটিকেও হারিয়ে দুই ম্যাচে পূর্ণ ছয় পয়েন্ট সংগ্রহ করে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করল পিএসজি।
বিশেষ করে উল্লেখ্য, এই ম্যাচটি ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক কোচ পেপ গার্দিওলার জন্যও ছিল অত্যন্ত আবেগঘন ও বিশেষ। গত মৌসুম শেষে ক্লাব ছাড়ার পর এই প্রথমবার ইতিহাদ স্টেডিয়ামে ফিরেছিলেন তিনি। দর্শকদের উষ্ণ অভ্যর্থনা ও ভালোবাসা পেলেও শেষ পর্যন্ত গ্যালারিতে বসে পুরোনো দলের এমন বড় হারের হতাশাজনক দৃশ্যই দেখতে হয়েছে এই স্প্যানিশ কোচকে।
পড়ুন : কেইনের জোড়া গোল ও ওলিসের লাল কার্ড: চ্যাম্পিয়নস লিগে ড্র নিয়ে ফিরল বায়ার্ন মিউনিখ
সা/


