শরতের আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের ভেলা, শিউলি ফুলের সুবাস এবং কাশফুলের দোল—সব মিলিয়ে প্রকৃতি জানান দেয় মা দুর্গার মর্ত্যে আগমন বার্তা। আর এই আগমনের মধ্য দিয়েই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসাবের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে মহাষ্ঠীর মাধ্যমে। বাঙালি সংস্কৃতির রক্তে মিশে থাকা এই শারদ উৎসবের প্রতিটি দিনই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, তবে ‘ষষ্ঠী’ বা মহাষষ্ঠীর দিনটি নিয়ে ভক্তদের আনন্দ ও উদ্দীপনা থাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার।
মহাষষ্ঠীর পৌরাণিক ও ধর্মীয় তাৎপর্য
ষষ্ঠী তিথি মানেই দেবী দুর্গার বোধন, আমন্ত্রণ এবং অধিবাস। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, ত্রেতাযুগে শ্রী রামচন্দ্র লঙ্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে শরৎকালে দেবী দুর্গার অকালবোধন করেছিলেন। সেই থেকে হিন্দু সমাজে শরৎকালের এই সময়ে দুর্গোৎসব পালনের রেওয়াজ চলে আসছে। সাধারণত মহালয়ার দিন দেবীর চক্ষুদানের মাধ্যমে প্রতিমার রূপদান সম্পন্ন হলেও, মূল পূজার শুরু হয় ষষ্ঠীর বোধনের মাধ্যমেই। ‘বোধন’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো ঘুম ভাঙানো বা জাগ্রত করা। বিশ্বাস করা হয়, দেবীকে নিদ্রা থেকে জাগিয়ে এই দিনে পূজামণ্ডপে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বটবৃক্ষ বা বেলতলায় দেবীর বোধন ও পূজা সম্পন্ন করার একটি প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে, যা ষষ্ঠীর পূজাকে আরও বেশি আধ্যাত্মিক ও বৈচিত্র্যময় করে তোলে।
ষষ্ঠীর দিনে মণ্ডপের পরিবেশ ও উৎসবের আমেজ
মহাষষ্ঠীর দিন সকাল থেকেই চারদিকে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ঢাকের বাদ্য, কাঁসর-ঘণ্টার ধ্বনি এবং শঙ্খের আওয়াজে মুখরিত হয়ে ওঠে প্রতিটি পূজামণ্ডপ। মণ্ডপে মণ্ডপে নতুন পোশাকে সেজে মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করে। এটি কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং সব শ্রেণি, পেশা ও বয়সের মানুষের মিলনের এক অপূর্ব মহোৎসব। পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ, ধূপের ধোঁয়া আর আলোর রোশনাইয়ে চারপাশের আকাশ-বাতাস যেন এক পবিত্র আমেজে ভরে ওঠে। ছোটোদের কোলাহল, তরুণ-তরুণীদের আড্ডা আর প্রবীণদের স্মৃতিচারণে প্রতিটি পূজামণ্ডপ হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।
প্রতিমা দর্শন ও মণ্ডপ পরিক্রমা
ষষ্ঠীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো প্রতিমা দর্শন। যদিও পঞ্চমী বা তার আগেও কিছু মণ্ডপ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়, তবে ষষ্ঠীর সান্ধ্যকালীন প্রতিমা দর্শনের আনন্দই আলাদা। মণ্ডপের নান্দনিক আলোকসজ্জা এবং শৈল্পিক প্রতিমাগুলো রাতের আলোয় যেন আরও বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে গ্রামের মেঠো পথ—সব জায়গাতেই যেন আনন্দের প্লাবন বয়ে যায়। এই দিনটিতে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে ঘুরে মণ্ডপ দেখার উচ্ছ্বাস থাকে তুঙ্গে।
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও সামাজিক সম্প্রীতি
শারদীয় দুর্গোৎসব কেবল একটি বিশেষ ধর্মের উৎসব নয়, এটি সর্বজনীন আনন্দের এক মিলনমেলা। ষষ্ঠীর দিন থেকেই বাংলার প্রতিটি কোণে এই অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ একে অপরের আনন্দ ভাগ করে নেয়। পূজার মণ্ডপগুলো হয়ে ওঠে এক সর্বজনীন মিলনকেন্দ্র, যেখানে ভেদাভেদের দেয়াল ভেঙে সবাই একসঙ্গে সামিল হয় উৎসবে। এই সার্বজনীনতাই বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
মহাষষ্ঠীর সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই যেন মর্ত্যলোক মেতে ওঠে উৎসবের মোহনীয় আবহে। এটি আগামী চারদিনের আনন্দ, ঐতিহ্য এবং ভক্তির এক বর্ণাঢ্য যাত্রার প্রথম সোপান। বোধন আর আমন্ত্রণ পর্ব পেরিয়ে দেবী দুর্গার এই আগমন বার্তা মানুষের মনে জাগায় অশুভ শক্তির বিনাশ আর সত্য ও সুন্দরের জয়ের প্রত্যাশা। সব গ্লানি ও হতাশা ভুলে ষষ্ঠীর আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে প্রতিটি মানুষের হৃদয়, আর এভাবেই বছর ঘুরে বাঙালির জীবনে ফিরে আসে প্রাণের শারদোৎসব।
পড়ুন : সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী, পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারের নির্দেশ
সা/


