“বারবার ভেঙেছি, তবুও থামিনি”: চাকরি ও ২৭০ ভিডিও হারিয়েও ঘাটাইলের কনটেন্ট ক্রিয়েটর রিগানের নতুন সংগ্রাম

জীবনের পথচলা সব সময় মসৃণ হয় না। কখনো সেখানে থাকে কাঁটা, কখনো ব্যর্থতার দেয়াল। জীবনের একের পর এক বাধা ডিঙিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণের অদম্য পথেই হেঁটে চলেছেন টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার জামুরিয়া ইউনিয়নের লাউয়া গ্রামের তরুণ মো. রিগান। চাকরি হারানো, ব্যবসায়িক ক্ষতি এবং সামাজিক প্রতিকূলতার পর ফেসবুকের ২৭০টি ভিডিও হারিয়েও দমে যাননি তিনি; বরং শূন্য থেকে শুরু করে আজও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এই কনটেন্ট ক্রিয়েটর।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষা ও জীবনের মোড় পরিবর্তন

লাউয়া গ্রামের সরকার বাড়ির সন্তান রিগান বাবা হযরত আলী (নিশা) ও মা সাবিনা পারভীনের দুই ভাই এবং এক বোনের মধ্যে ভাইদের মধ্যে বড়। স্থানীয় বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাসের পর তিনি ইংরেজি বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হন। তবে ফাইনাল ইয়ারের সময় প্রেমঘটিত বিয়ে ও পারিবারিক পরিবর্তনের কারণে তাঁর পড়াশোনার স্বাভাবিক গতি থমকে যায়।

এরপর শুরু হয় জীবিকার তাগিদে তাঁর কঠোর সংগ্রাম। বড় বোনের সহযোগিতায় কয়েক দফায় চাকরিতে যোগ দিলেও তা বেশি দিন টেকেনি। একপর্যায়ে চট্টগ্রামের একটি লবণ ফ্যাক্টরিতে কাজ নিলেও সেখানে স্থায়িত্ব মেলেনি। পরবর্তীতে এলাকায় পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষের মাধ্যমে কিছুটা লাভের মুখ দেখলেও, পুকুর সংস্কারের কারণে মালিক লিজ বাতিল করায় আবার শূন্য হাতে ফিরে আসতে হয় তাঁকে।

ডিজিটাল মাধ্যমে পথচলা ও প্রথম বড় ধাক্কা

বারবার ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েও হতাশ হননি রিগান। এক বন্ধুর পরামর্শে নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে প্রফেশনাল মোড চালু করে শুরু করেন ভিডিও নির্মাণ। টানা সাত-আট মাস দিন-রাত পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রায় ২৭০টি ভিডিও তৈরি করেন তিনি। কিন্তু ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ব্যবহারের কারণে কপিরাইট সমস্যায় পড়ে এক নিমিষেই ডিলিট হয়ে যায় তাঁর সবকটি ভিডিও।

সেই কঠিন মুহূর্তের কথা স্মরণ করে রিগান বলেন, “যে ভিডিওগুলো তৈরি করতে দিনের পর দিন পরিশ্রম করেছিলাম, যে কাজের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আমার স্বপ্ন—সেগুলো একে একে হারিয়ে গেল। কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম। মনে হয়েছিল—হয়তো আমার জীবনে ভালো কিছু লেখা নেই।”

নতুন অনুপ্রেরণা ও পেশাদার সাফল্য

ভিডিও হারিয়ে ভেঙে পড়ার পর পাশে পান প্রতিবেশী উপজেলা কালিহাতীর মানিক মিয়া এবং ময়মনসিংহের আল আমিনকে। তাঁদের কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে নতুন করে ফানি ভিডিও তৈরি শুরু করেন তিনি।

মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে তিনি অর্জন করেন ‘Facebook Ads on Reels monetization’। এরপর পর্যায়ক্রমে In-stream Ads, Stars Monetization এবং Content Monetization সুবিধা লাভ করেন তিনি। বিগত প্রায় পাঁচ বছরের এই পথচলায় একসময় ভালো আয় হলেও, সম্প্রতি তা কিছুটা কমেছে। তবুও থামেননি তিনি; ফেসবুকের পাশাপাশি ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকেও তাঁর কাজ প্রকাশ করে যাচ্ছেন।

সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক চড়াই-উতরাই

যখন কাজ শুরু করেছিলেন, তখন ঘাটাইলে সরঞ্জাম বা টিমের বড় অভাব ছিল। দামি ক্যামেরা বা বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ছাড়াই নিজস্ব সামর্থ্যে কাজ চালিয়ে যান রিগান। কাজের সূত্রে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর কটূকথাও শুনতে হয়েছে তাঁকে। শুরুতে সাত-আটজনের টিম থাকলেও বর্তমানে তাঁর সাথে নিয়মিত কাজ করছেন ফরহাদ কমেডি ও জয়।

প্রতিকূলতা ও সমালোচনাকে পেছনে ফেলে রিগানের স্পষ্ট বক্তব্য, “পথ যতই কঠিন হোক, হাঁটতে হয়—স্বপ্ন যদি সত্যি হয়, একদিন ঠিকই পেতে হয়। পড়ে গেলে কাঁদব, আবার উঠে দাঁড়াব—হার মানব না, স্বপ্নের পিছু ছুটেই যাব। ঝাড় এলে গাছ নড়ে, কিন্তু শিকড় যদি শক্ত থাকে—গাছ ভেঙে পড়ে না।”

সব হারিয়েও নিজের অর্জিত অভিজ্ঞতাকে সঙ্গী করে প্রতিদিন নতুন উদ্যমে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াচ্ছেন এই তরুণ। সফলতার চূড়ান্ত গন্তব্যে না পৌঁছালেও তাঁর অদম্য চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আত্মবিশ্বাসের সাথে রিগান বলেন, “বারবার পড়ে যাওয়া ব্যর্থতা নয়, পড়ে গিয়ে আর উঠে না দাঁড়ানোই আসল ব্যর্থতা। আমি চেষ্টা চালিয়ে যাবো, ইনশাআল্লাহ। সফলতা একদিন ঠিকই আসবে।”

পড়ুন : দুই বাংলাদেশি পুলিশ সদস্যকে ফেরত দিলো বিএসএফ

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন