ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুই দিনে চারটি আলাদা অভিযান চালিয়ে প্রায় ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকার পণ্য জব্দ করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। জব্দ করা পণ্যের মধ্যে আছে সোনার বার,মদ,মুখের বলিরেখা কমানোর ইনজেকশন, আমদানি নিষিদ্ধ ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম ও ব্যবহৃত ল্যাপটপ। শনিবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার, অর্থাৎ ১৫ ও ১৬ অক্টোবর, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসব অভিযান চালানো হয়। জব্দ পণ্যের মধ্যে রয়েছে ১১৭ গ্রাম ওজনের সোনার বার,৩০ লিটার মদ,১৫৫টি ডার্মাল ফিলার ও স্কিন বুস্টার ইনজেকশন ১ হাজার ১০৪ কেজি গৌরি ক্রিম এবং ২৩টি ব্যবহৃত ল্যাপটপ। এসব পণ্যের মোট আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি ২২ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। কাস্টমস গোয়েন্দা জানিয়েছে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা,ভোক্তার অধিকার রক্ষা,অবৈধ পণ্যের আমদানি ঠেকানো এবং রাজস্ব ফাঁকি রোধেই এসব অভিযান চালানো হয়েছে।
সোনা উদ্ধারের ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রামে। দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-১৪৮ ফ্লাইটের এক যাত্রীকে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে গ্রিন চ্যানেলে নজরদারিতে নেওয়া হয়। ওই যাত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান শুরুতে ১০০ গ্রাম সোনা সঙ্গে থাকার কথা ঘোষণা করেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সোনার বার বহনের কথা অস্বীকার করেন। পরে অন্যান্য সংস্থার উপস্থিতিতে কাস্টমস হলরুমে দেহ তল্লাশি করে ১১৭ গ্রামের একটি সোনার বার উদ্ধার করা হয়। শুল্ক-করসহ এর আনুমানিক মূল্য ২১ লাখ ৬ হাজার টাকা। এ ঘটনায় লক্ষণীয় বিষয় হলো, ঘোষিত ওজনের চেয়ে প্রকৃত ওজন বেশি পাওয়া গেছে এবং সোনার বারটি দেহের সঙ্গে লুকানো ছিল।
একই দিনে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আলাদা তৎপরতায় ৩০ লিটার মদ আটক করেন কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। মুম্বাই থেকে আসা এয়ার ইন্ডিয়ার এআই-২১৮৩ ফ্লাইটের এক যাত্রীর ব্যাগ থেকে ১৬ লিটার মদ পাওয়া যায়। এ ছাড়া বিমানবন্দরের একটি টয়লেটে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় সাড়ে ৭ লিটার মদ। অন্য দুই যাত্রীর কাছ থেকে জব্দ করা হয় আরও সাড়ে ৬ লিটার। আটক মদের আনুমানিক বাজারমূল্য ৬ লাখ টাকা। টয়লেটে মদ ফেলে যাওয়ার ঘটনা ইঙ্গিত দেয়, তল্লাশির ভয়ে কেউ কেউ পণ্য ফেলে চলে যান।
সবচেয়ে বেশি মূল্যের একক জব্দ ছিল ইনজেকশনের চালান। ১৬ অক্টোবর কলম্বো থেকে আসা শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্সের ইউএল-১৮৯ ফ্লাইটের এক যাত্রীর ব্যাগেজ তল্লাশি করে ১৫৫টি ডার্মাল ফিলার ও স্কিন বুস্টার ইনজেকশন পাওয়া যায়। বেলা ১১টা ১৩ মিনিটে সন্দেহজনক ব্যাগ স্ক্যান ও পরীক্ষা করে এসব পণ্য উদ্ধার করা হয়। যাত্রীর নাম মো. রাকিব হোসেন। জব্দ করা ইনজেকশনের মূল্য ৫৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। এর মধ্যে রয়েছে রেস্টিলেন লিডোকেইন ৫৫টি, রেস্টিলেন লিফট লিডোকেইন ৫৪টি, জুভেডার্ম ভলিউমা উইথ লিডোকেইন ৪০টি এবং প্রোফাইলো ৬টি।
কাস্টমস গোয়েন্দা জানায়, মুখের বলিরেখা কমানো, ত্বকের সৌন্দর্য বাড়ানো ও ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা উন্নত করতে এসব পণ্য ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া ব্যবহার করলে সংক্রমণ, রক্তনালিতে বাধা,ত্বকের স্থায়ী ক্ষতি এবং গুরুতর ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকি থাকে। আটক পণ্যগুলোর নিয়ন্ত্রক অনুমোদন আছে কি না এবং আমদানি বৈধ ছিল কি না,তা এখনো যাচাই করা হচ্ছে। সৌন্দর্যচর্চার এসব পণ্যের চাহিদা বাড়ায় অনেক সময় অননুমোদিত পথে এগুলো দেশে ঢোকে। ফলে ভোক্তারা না জেনেই ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
সবচেয়ে বড় অঙ্কের জব্দ হয়েছে ঢাকার বিমান বন্দরের ফরেন পোস্ট অফিসে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে ১ হাজার ১০৪ কেজি আমদানি নিষিদ্ধ গৌরি স্কিন হোয়াইটেনিং ক্রিম এবং ২৩টি ব্যবহৃত কোর আই-৫ ল্যাপটপ জব্দ করা হয়। এসব পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য ২ কোটি ৩৮ লাখ ৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ মোট জব্দ মূল্যের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি এসেছে এই একটি অভিযান থেকে। এতে বোঝা যায়, যাত্রীর সঙ্গে আনা পণ্যের পাশাপাশি ডাকযোগে আসা চালানও নজরদারির বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।
কাস্টমস গোয়েন্দার ভাষ্য, অননুমোদিত স্কিন হোয়াইটেনিং ক্রিমে ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকার আশঙ্কা রয়েছে। কিছু ত্বক ফর্সাকারী পণ্যে পারদ ও অননুমোদিত স্টেরয়েডের মতো উপাদান থাকে, যা ত্বক, কিডনি ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তবে জব্দ করা গৌরি ক্রিমে এসব উপাদান আছে কি না, তা পরীক্ষার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে। ফলে এ বিষয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
ব্যবহৃত ল্যাপটপের বিষয়ে কাস্টমস গোয়েন্দা বলছে, আমদানি নিষিদ্ধ এসব পণ্য নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বাজারে ঢুকলে ক্রেতারা পণ্যের মান, কার্যক্ষমতা ও নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকিতে পড়বেন। যথাযথ মান যাচাই ছাড়া বিক্রি হলে ক্রেতারা আর্থিক ক্ষতির শিকারও হতে পারেন। এ ছাড়া বৈধভাবে আমদানিকারী ব্যবসায়ীরাও অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন।
সব মিলিয়ে এই চার অভিযানে চোরাচালান ও অবৈধ আমদানির বিভিন্ন ধরন সামনে এসেছে। সোনা এসেছে যাত্রীর শরীরে লুকিয়ে, মদ এসেছে ব্যাগেজে এবং টয়লেটে ফেলে রাখা অবস্থায়, ইনজেকশন এসেছে ব্যাগে, আর ক্রিম ও ল্যাপটপ এসেছে ডাকযোগে। এতে স্পষ্ট, বিমানবন্দর দিয়ে অবৈধ পণ্য প্রবেশের পথ একাধিক। একই সঙ্গে গোপন তথ্য, ব্যাগেজ স্ক্যান ও দেহ তল্লাশির মতো পদ্ধতিতে সেসব ধরা পড়ছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর জানিয়েছে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, ভোক্তার অধিকার রক্ষা, বৈধ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধে দেশের সব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর,সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর ও অন্যান্য শুল্ক স্টেশনে নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে। জব্দ পণ্যের পরীক্ষার ফল ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার যাচাইয়ের পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ স্পষ্ট হবে।
পড়ুন:কক্সবাজারে ইনানীতে রিসোর্টে আগুন, ১০ পর্যটকের মৃত্যু
ইমি/


