কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানী পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন ‘টুপটুপ রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ ১০ জনের প্রাণহানির ঘটনায় রিসোর্টের মালিক তানভীর আহমদকে প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে এই মামলায় রিসোর্টের ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকেও আসামি করা হয়েছে। গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) দিবাগত রাতে উখিয়া থানা পুলিশ বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) বিষয়টি নিশ্চিত করে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার দিনই (শনিবার) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে রিসোর্টের ম্যানেজার সুমনকে আটক করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে থানায় রাখা হয়েছে।
দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপট ও হতাহতদের পরিচয়
গত শনিবার সকাল ৭টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক এলাকায় অবস্থিত ইট ও কাঠ দিয়ে তৈরি তিনতলা বিশিষ্ট ‘টুপটুপ’ রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। আগুন লাগার সময় রিসোর্টের অধিকাংশ পর্যটক ঘুমাচ্ছিলেন বিধায় অনেকে কক্ষের ভেতরে আটকা পড়েন। দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে এবং প্রাণ বাঁচাতে কয়েকজন রিসোর্ট থেকে লাফিয়ে নিচে পড়েন।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত ১০ জনের মধ্যে ইতিমধ্যে ৮ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন— ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির মেলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), নাফিজের বড় বোন ফারিয়া কবির (৩৩), তার পাঁচ বছর বয়সী ভাগ্নে ফায়িজান আহম্মেদ, সাভারের ‘স্বপ্ন বিলাস স্কুল’-এর শিক্ষক নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. নাফিস তেহামী। নিহতদের মধ্যে ছয়জন একই পরিবারের সদস্য। বাকি দু’জনের পরিচয় এখনও জানা যায়নি।
এছাড়া এই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ছয়জনকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তারা হলেন— মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন সাদী (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) এবং সামিদা (৩২)। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন হতাহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আগুন লাগার কারণ ও প্রাথমিক তদন্ত
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, রিসোর্টের রান্নাঘরের দিক থেকে বিকট শব্দ শোনার পরপরই আগুনের সূত্রপাত হয় এবং মুহূর্তের মধ্যে তা পুরো স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট সকাল ৮টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
প্রাথমিকভাবে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করছেন জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান ও উখিয়া থানার ওসি। তবে প্রকৃত কারণ উদঘাটনে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই অগ্নিকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওই রিসোর্টে মোট ৯টি কক্ষ ছিল। ঘটনার আগের রাতে তিনটি কক্ষের পর্যটকরা চেকআউট করায় বাকি ৬টি কক্ষে ১৬ জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন সকালে বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।
অনুমোদনহীন ও নিরাপত্তাহীনভাবে রিসোর্ট পরিচালনা
তদন্তে রিসোর্টটির বিরুদ্ধে ভয়াবহ অনিয়ম ও নিরাপত্তার চরম অবহেলার চিত্র উঠে এসেছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানান, টুপটুপ রিসোর্টের কোনো ধরনের অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছিল না। এমনকি গত জুন মাসেও রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। পাশাপাশি পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকায় পরিবেশ অধিদপ্তর গত ১৩ মে রিসোর্টটিকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল। রান্নাঘর ও আবাসিক ব্যবস্থা একই ভবনে থাকা এবং পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা না থাকায় এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে ঘটনার মূল মালিক তানভীর আহমদসহ পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পড়ুন : পিস্তল হাতে ইশরাক হোসেনের মাদকবিরোধী অভিযান: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী ও সমালোচকরা
সা/


