তেহরান-ওয়াশিংটন টানাপোড়েনের মধ্যে ফের ইরান যাচ্ছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে বাড়তে থাকা উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করতে আবারও ইরান সফরে যাচ্ছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) তাঁর তেহরানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সফরে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত নিরসনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার উদ্যোগ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

বার্তা সংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার (১৯ অক্টোবর) ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো আসিম মুনিরের সম্ভাব্য সফরের খবর প্রকাশ করে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, সফরে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের অবসান, কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করা এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি গুরুত্ব পাবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে পাকিস্তান সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। দুই দেশের সঙ্গে ইসলামাবাদের যোগাযোগ বজায় থাকায় সংঘাত নিরসনে নতুন কোনো সমঝোতার পথ তৈরি হয় কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে আগ্রহ রয়েছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই সংকট নিরসনে উদ্যোগী হয়েছে পাকিস্তান। দেশটি দুই পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে ইসলামাবাদের এই তৎপরতা দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনার পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের জুনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ স্বাক্ষর করে। এর মাধ্যমে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে আলোচনার একটি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল।

তবে সমঝোতার উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত স্থায়ী অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারেনি। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের মতবিরোধের কারণে পরবর্তী আলোচনা ভেঙে পড়ে।

ফলে সংঘাত বন্ধে কার্যকর সমাধানে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা থেকেই গেছে। এমন পরিস্থিতিতে আসিম মুনিরের নতুন সফরকে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় সক্রিয় করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও সফরে নির্দিষ্ট কোনো চুক্তি বা সমঝোতা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্তকারী এই নৌপথ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।

প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে। তেলের সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

এ কারণে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যেকোনো সম্ভাব্য সমঝোতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে ব্যবধান থাকায় আলোচনায় অগ্রগতি অর্জন কঠিন হয়ে পড়েছে।

আসিম মুনিরের তেহরান সফরে এই বিরোধ নিরসনের কোনো পথ বেরিয়ে আসে কি না, তা বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাকিস্তান মধ্যস্থতার মাধ্যমে উভয় পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে পারলে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরও পড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় আঞ্চলিক দেশগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে।

এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ইসলামাবাদ উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রাখতে চাইছে। আসিম মুনিরের সফর সেই প্রচেষ্টারই অংশ।

তবে সংঘাত নিরসনের পথ এখনো জটিল। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, নৌপথের নিরাপদ ব্যবহার এবং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি দূর করার মতো বিষয়গুলোতে সমঝোতা ছাড়া স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।

সব মিলিয়ে, আসিম মুনিরের পুনরায় ইরান সফর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকট নিরসনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে আরও সক্রিয় করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তেহরানে আলোচনার মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয় কি না, এখন সেদিকেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।

পড়ুন:নির্বাচনের আগে চাপে নেতানিয়াহু, জরিপে এগিয়ে বিরোধী নেতা আইজেনকট

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন