আজ শুভ বিজয়া দশমী। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার কথা ভেবে সন্ধ্যার পূর্বেই বিসর্জন সম্পন্ন করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এই প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমেই সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার। ফলে দেশের প্রতিটি মণ্ডপজুড়ে এখন বেজে উঠেছে বিদায়ের সুর। বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীর দিন মর্ত্য ছেড়ে বিদায় নিচ্ছেন দেবী দুর্গা।
বাংলাদেশজুড়ে কেবল ধর্মীয় আবহেই নয়, বরং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অপরিহার্য অংশ হিসেবে প্রতিবছর এই উৎসব উদযাপিত হয়। বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে একসুতোয় বেঁধে এই পুজো দেশের দীর্ঘদিনের অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চিত্রকেই তুলে ধরে। শারদীয় এই উৎসবকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার নানা এলাকা সেজে ওঠে নানা রঙের সাজে, বসানো হয় দৃষ্টিনন্দন তোরণ। প্রতিটি মণ্ডপ প্রাঙ্গণেই আয়োজন করা হয় নানাবিধ বিশেষ অনুষ্ঠানের।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দীর্ঘদিনের চাহিদার বিষয়টি মাথায় রেখে এবার সরকারের নির্বাহী আদেশে দুর্গাপূজার ছুটি বাড়িয়ে তিন দিন করা হয়। বিজয়া দশমীর নির্ধারিত সরকারি ছুটির সাথে এই বর্ধিত ছুটি এবং শুক্র-শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে মোট ৫ দিনের (২০ থেকে ২৪ অক্টোবর) একটি দীর্ঘ অবকাশ তৈরি হয়েছে। টানা এই ছুটির কারণে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উৎসবের আনন্দ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মাধ্যমে সূচনা হয়েছিল ৬ দিনব্যাপী এই উৎসবের। টানা আড়ম্বরের পর বুধবার দেবী বিসর্জনের মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক ইতি টানা হচ্ছে। এই শুভ বিজয়া দশমী উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়কে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিএনপিসহ নানা রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
শারদীয় দুর্গোৎসব কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে মিশে থাকা এক উৎসব। আবহমান কাল ধরে এ দেশের হিন্দু সম্প্রদায় অত্যন্ত আনন্দ ও ভক্তির সাথে দেবী দুর্গার আরাধনা করে আসছে। দেবীপক্ষের সূচনার পর মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী ও মহানবমীর ভাবগাম্ভীর্য শেষে বিজয়া দশমীর মাধ্যমে এই বর্ণিল উৎসবের সাঙ্গ হয়। বিজয়া দশমী একদিকে যেমন দেবীর বিসর্জনের করুণ সুর বহন করে, অন্যদিকে রেখে যায় সামাজিক সম্প্রীতি ও শুভ শক্তির বার্তা।
বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে এবং শহরাঞ্চলে দুর্গাপূজার রূপময় বৈচিত্র্য দেখা যায়। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও রংপুরসহ দেশের প্রতিটি প্রান্তে পূজা ঘিরে গড়ে ওঠে উৎসবের আমেজ।
ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পূজা: পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পূজা মণ্ডপগুলো ঐতিহ্যের ধারক। ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে ঘিরে জাতীয় পর্যায়ে সবচেয়ে বড় আনুষ্ঠানিকতা উদযাপিত হয়।
সার্বজনীন আনন্দ: গ্রাম বাংলায় পূজার দিনগুলোতে তৈরি হয় এক মেলাঙ্গন। সেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ ভিড় জমায়। নতুন পোশাক পরা, প্যান্ডেল ঘুরে দেখা আর ঢাকের বাদ্যে মেতে ওঠা বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনকে করে তোলে উৎসবমুখর।
দশমীর দিনে মণ্ডপে মণ্ডপে নেমে আসে বিষাদের ছায়া। মর্ত্য ছেড়ে দেবী পুনরায় কৈলাসে ফিরে যাবেন—এই ভাবনায় ভক্তদের চোখ ছলছল করে ওঠে।
১. দর্পণ বিসর্জন ও দেবী বরণ
সকালে শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুযায়ী দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠার ইতি টানা হয়। এরপর বিবাহিত নারীরা দেবীর চরণে সিঁদুর, পান-পাতা ও মিষ্টি নিবেদন করে মায়ের বরণ সম্পন্ন করেন।
২. আনন্দময় সিঁদুর খেলা
দেবী বরণের পরই শুরু হয় সিঁদুর খেলা। মণ্ডপে মণ্ডপে নারীরা একে অপরকে সিঁদুরে রাঙিয়ে তোলেন। এই প্রথাটি সধবা নারীদের সৌভাগ্য ও পরিবারের দীর্ঘায়ুর প্রার্থনার প্রতীক। হাসিখুশি ও সিঁদুরের লাল রঙে মণ্ডপগুলোতে এক অনাবিল আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
৩. বুড়িগঙ্গা ও বুড়ির চরের শোভাযাত্রা (বিসর্জন)
বিকেলের আলো ফুরিয়ে এলে শুরু হয় বর্ণাঢ্য বিসর্জন শোভাযাত্রা। ঢাকার ওয়াইজঘাট (বুড়িগঙ্গা নদী), তুরাগ নদী এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নদী ও জলাশয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। বিসর্জনের সময় বাতাসে প্রতিধ্বনি হয় হাজারো ভক্তের কণ্ঠের আকুতি— “আসছে বছর আবার হবে!”
বাংলাদেশে দুর্গাপূজা ও বিজয়া দশমী এক অসাম্প্রদায়িক চেতনার স্মারক। বিসর্জনের পর থেকেই শুরু হয় কোলাকুলি, প্রণাম ও কুশল বিনিময়ের পালা।
মিষ্টিমুখের সংস্কৃতি: ঘরে ঘরে তৈরি হয় নারিকেলের নাড়ু, মোয়া, পায়েস, মিষ্টি ও নিমকি। পূজার দিনগুলোতে অমুসলিম বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীরাও নিমন্ত্রণে অংশ নেন এবং মিষ্টিমুখে আনন্দ ভাগ করে নেন।
রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব ও শুভেচ্ছা: বাংলাদেশে পূজার দিনগুলোতে সরকারি ছুটি থাকে এবং রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ পূজা মণ্ডপগুলোতে শুভেচ্ছা জানান। যা বাংলাদেশের হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক চমৎকার উদাহরণ।
বিজয়া দশমীর মূল দর্শন কেবল বাহ্যিক প্রতিমা বিসর্জন নয়, বরং মনের ভেতরের লোভ, হিংসা, অহংকার ও অন্যায়বোধ নামক ‘অসুর’কে বিনাশ করা। সামাজিক ভ্রাতৃত্ববোধ টিকিয়ে রাখা এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যেন শান্তিতে বসবাস করতে পারে—এই প্রার্থনাই বিজয়ার মূল বার্তা।
চোখের জলে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানালেও ভক্তদের হৃদয়ে রেখে যান বিজয়ার আলো। সেই আশার আলোতেই কেটে যায় পুরো একটি বছর। শান্তি, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় হোক—এই কামনায় সবাইকে জানাই শুভ বিজয়া!
পড়ুন : রাষ্ট্র সবার জন্য সমান অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করবে : প্রধানমন্ত্রী
সা/


