‘ও বাবা, তোমরা আমার পেটের পোলার নাগান। মা হইয়া আমি চাইতেছি, আমার মাইয়ারে আইনা দাও, আমার আত্মাটার শান্তি করো।’—সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি নারীর বৃদ্ধা মায়ের এই আহাজারিতে ফুটে উঠেছে স্বজন হারানোর গভীর বেদনা। মেয়েকে হারানোর শোকের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে শেষবারের মতো তার মুখ দেখার এবং দেশের মাটিতে দাফন করার আকুতি।
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার এই বৃদ্ধা মেয়ের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে ভেঙে পড়েছেন। পরিবারের ভাষ্য, গত প্রায় সাত দিন ধরে তিনি ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করছেন না। আগে থেকেই অসুস্থ থাকা এই মায়ের শারীরিক অবস্থাও আরও খারাপ হয়েছে।
নিহত নারীর আরেক মেয়ে বিবিসি বাংলাকে বলেন, “খবরটা শোনার পর থাইকাই সারাক্ষণই খালি কান্না-কাটি করতাছে। বয়স হইছে, এমনেই অসুস্থ থাকে। এর মধ্যে খাওয়া-দাওয়া ছাইড়া দেওয়ায় আরও অসুস্থ হইয়া পড়ছে।”
পরিবারের কাছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগের দিনও ওই নারীর সঙ্গে তাদের কথা হয়েছিল। তখনও তারা জানতেন না, পরদিনই শুনতে হবে তার মৃত্যুর খবর।
নিহত নারীর বড় বোন বলেন, “আমরা এর কিছুই জানতাম না। আমার বোনও কিছু কয় নাই। খালি জানতাম যে, সৌদির জেলখানায় বন্দি আছে। পরে গেল বুধবার হের এক বান্ধবী হঠাৎ ফোন দিয়া কয় যে, মৃত্যুদণ্ড হইছে।”
এখন পরিবারের একটাই চাওয়া—সৌদি আরব থেকে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হোক। শেষবারের মতো বোনের মুখ দেখা এবং দেশের মাটিতে তাকে দাফন করার সুযোগ চান স্বজনেরা।
নিহত নারীর বড় বোনের ভাষায়, “সরকার যেন আমার বোনরে ফেরত এনে দেয়। হের কবরটা যেন এখানে দিতে পারি। এতটুকুই চাওয়া।”
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া অপর বাংলাদেশির পরিবারও একই আকুতি জানিয়েছেন। ছেলের মুখ তিন বছর তিন মাস ধরে দেখতে না পাওয়া তার বাবা অন্তত শেষবারের মতো সন্তানের মুখ দেখতে চান।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, “তিন বছর তিন মাস হয় ছেলের মুখ দেখি না। আমি যেন ছেলের চেহারা শেষবারের মতো দেখতে পারি।”
মরদেহ ফেরত নিয়ে অনিশ্চয়তা
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। তবে শেষ পর্যন্ত সেই চেষ্টা কতটা সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক ও অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, অতীতে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর অনেক বিদেশি নাগরিকের মরদেহ নিজ দেশে ফেরত না পাঠানোর নজির রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটেছে।
তার ভাষায়, “সংশয় প্রকাশের অবকাশ রয়েছে, কারণ এ ধরনের ঘটনায় অতীতে অনেক বিদেশি নাগরিকের মরদেহ তাদের দেশে ফেরত না পাঠানোর নজির সৌদি আরবের আছে। এমনকি, বাংলাদেশের সঙ্গেও আগে এমনটা ঘটেছে।”
গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের সরকারি বার্তা সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) জানায়, দেশটির সরকার দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ লিপ্ত হওয়ার শাস্তিস্বরূপ’ দেশটির আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানান, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসকে কোনো তথ্য জানায়নি। ফলে বিদেশে আটক বা বন্দি নাগরিকের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার কিংবা দূতাবাসকে অবহিত করার আন্তর্জাতিক বিধান মানা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, বিদেশে আটক কোনো নাগরিকের ক্ষেত্রে তার দেশের কনস্যুলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকারসহ বিভিন্ন সুরক্ষার বিধান রয়েছে। এ ঘটনায় সৌদি কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এবং বাংলাদেশি দূতাবাসকে তথ্য না দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও ক্ষোভ দেখা দেয়।
সৌদির কাছে জবাব চেয়ে চিঠি
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরদিন, ১৫ অক্টোবর, জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠায়। এতে নিহতদের নাম-পরিচয়সহ ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানাতে অনুরোধ করা হয়।
এরপর ১৮ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়াকে ডেকে চিঠিটির একটি অনুলিপি হস্তান্তর করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সে সময় কর্মকর্তারা দ্রুত জবাব পাওয়ার আশা প্রকাশ করেছিলেন।
কিন্তু বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শুধু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য নয়, সংশ্লিষ্ট মামলার রায়ের অনুলিপিও চাওয়া হয়েছে। রায়ের বিস্তারিত হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সরকারের প্রতিনিধিরা।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে সৌদির অতীত রেকর্ড
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সৌদি আরব অন্যতম আলোচিত দেশ। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সৌদি আরবে অন্তত ৮১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে রেকর্ড ৩৪৫টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে দেশটি।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সাল পর্যন্ত এক দশকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বিরুদ্ধে মাদকসংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগ ছিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ড অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
মাদকসংক্রান্ত অপরাধে গত এক দশকে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৭৫ শতাংশই বিদেশি নাগরিক ছিলেন বলে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। মাদকের বাইরেও চুরি, ডাকাতি ও হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে বিদেশিদের মৃত্যুদণ্ড কিংবা অন্য মেয়াদে সাজা দেওয়ার ঘটনা রয়েছে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর বিদেশি নাগরিকদের মরদেহ পরিবারের কাছে ফিরিয়ে না দেওয়া এবং কোথায় দাফন করা হয়েছে, সে তথ্য স্বজনদের না জানানোর অভিযোগও পেয়েছে মানবাধিকার সংস্থাটি।
গত দুই দশকে বাংলাদেশের প্রায় ডজনখানেক নাগরিককে সৌদি আরবের আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়। এর মধ্যে ২০১১ সালে রিয়াদে কর্মরত আট বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত হয়। মিশরীয় এক নাগরিককে হত্যার দায়ে তাদের সাজা দেওয়া হয়েছিল।
শরিফুল হাসান বলেন, “কিন্তু তাদের কারো লাশ আমরা ফিরতে দেখি নাই। এবারও যে তেমনটি ঘটবে না, সেটা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না।”
সৌদি সরকার কেন কিছু ঘটনায় বিদেশি নাগরিকদের মরদেহ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে অনাগ্রহ দেখায়, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে সাধারণত এমন আপত্তি দেখা যায় না। বরং বিতর্কিত কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকা ঘটনার ক্ষেত্রে মরদেহ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তার ধারণা, এ ধরনের ঘটনায় মরদেহ ফেরত দিলে পরবর্তী সময়ে তদন্ত বা নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থেকে সৌদি কর্তৃপক্ষ অনাগ্রহ দেখাতে পারে।
কূটনৈতিক তৎপরতায় কি ফিরবে মরদেহ?
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সৌদি কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—স্বজনেরা তাদের মরদেহ পাবেন কি না। তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শরিফুল হাসান বলেন, “অধিকাংশ সময়ই এটা নির্ভর করে কূটনৈতিক তৎপরতা ও ভুক্তভোগী দেশের নাগরিকদের প্রতিক্রিয়ার মাত্রার ওপর।”
চলতি বছর ফেসবুকে একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ধর্ম অবমাননার দায়ে শ্রীলঙ্কার এক নাগরিককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল সৌদি আরব। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর তার মুক্তির দাবিতে শ্রীলঙ্কায় বিক্ষোভ হয়। পরে দেশটির সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার মুখে ওই ব্যক্তির সাজা মওকুফের সিদ্ধান্ত নেয় সৌদি সরকার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন শরিফুল হাসান। তিনি বলেন, “আমাদের দেশের সরকারও যদি কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সৌদি সরকারের ওপর কার্যকরভাবে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে তারাও নিহত দু’জনের লাশ ফেরত পাঠাতে বাধ্য হবে। অন্যথায়, এটা নিয়ে গড়িমসি করতে পারে।”
বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, সৌদি সরকারের কাছে পাঠানো চিঠিতে ঘটনার বিস্তারিত তথ্যের পাশাপাশি আদালতের রায়ের অনুলিপিও চাওয়া হয়েছে। রায় হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এক্ষত্রে নিহতদের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা যায়, আমাদের পক্ষ থেকে অবশ্যই সেই প্রচেষ্টা চালানো হবে।”
সরকারের এই আশ্বাসে আশায় বুক বাঁধছেন দুই পরিবারের সদস্যরা। তবে সৌদি সরকারের জবাব এবং মরদেহ ফেরত আনার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা কাটছে না। একদিকে মায়ের মেয়েকে শেষবার দেখার আকুতি, অন্যদিকে বাবার ছেলের মুখ দেখার আকাঙ্ক্ষা—দুই পরিবারের এখন একটাই প্রশ্ন, প্রিয়জনদের শেষবারের মতো দেখার সুযোগ কি মিলবে?
সূত্র: বিবিসি
পড়ুন: আজ খুলনা ও বাগেরহাট সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
আর/


