বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ধারার অন্যতম জারি গান। আধুনিক বিনোদনের ভিড়ে গ্রামবাংলার এই লোকজ সংগীতের চর্চা ক্রমেই কমে আসছে। হারিয়ে যেতে বসা সেই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে ময়মনসিংহের ত্রিশালে অনুষ্ঠিত হয়েছে এক বিশাল জারি গানের আসর। এতে নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের ব্যাপক সমাগম ঘটে।
বৃহস্পতিবার ত্রিশাল উপজেলার ৫ নং রামপুর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী কাকচর পশ্চিমপাড়া আদর্শ বাজারে স্থানীয় যুবসমাজের উদ্যোগে এ জারি গানের আয়োজন করা হয়।
উৎসবমুখর পরিবেশে ১৩টি দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে দর্শকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল জারি গানের সুর, আবেগ ও পরিবেশনা।
প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় একটি বড় ষাড় গরু, দ্বিতীয় পুরস্কার দেয়া হয় একটি মাঝারি ধরণের ষাড়গরু ও তৃতীয় পুরস্কার হিাসেবে দেয়া হয় একটি খাসি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) অফিসার ইনচার্জ মো. মনিরুজ্জামান খোকন। উদ্বোধন করেন ৫ নং রামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আপেল মাহমুদ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গফরগাঁও পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার মো. সানোয়ার হোসেন কাজল।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. মনিরুজ্জামান খোকন বলেন, জারি গানসহ গ্রাামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। সুস্থ বিনোদনের এসব মাধ্যমের চর্চা কমে যাওয়ায় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ মাদকের মতো সামাজিক ব্যাধির ঝুঁকিতে পড়ছে। তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা, গান ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করা জরুরি। এ ধরনের আয়োজন নতুন প্রজন্মকে ইতিবাচক কর্মকান্ডে যুক্ত করার পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার করবে। জারি গান উপভোগ করতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষের আগমন এ ঐতিহ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহেরই প্রমাণ।
আয়োজনে আসা স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, একসময় গ্রামবাংলায় নিয়মিত জারি গানের আসর বসত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এ ধরনের আয়োজন এখন অনেকটাই কমে গেছে। কাকচর পশ্চিমপাড়া আদর্শ বাজারে এমন একটি আয়োজন দেখতে পেরে তারা আনন্দিত। স্থানীয় যুবসমাজের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তারা বলেন, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে আয়োজকদের উৎসাহিত করা সবার দায়িত্ব।
স্থানীয়দের ভাষ্য, জারি গানের আসরে নারী-পুরুষ, ছোট-বড় সব বয়সী মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। গানের পরিবেশনা ঘিরে পুরো এলাকায় তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। হারিয়ে যেতে বসা এ লোকজ সংস্কৃতির এমন আয়োজন নিয়মিত হলে নতুন প্রজন্ম বাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
জারি গান মূলত কারবালার মর্মান্তিক যুদ্ধ এবং ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেনের বেদনাবিধুর কাহিনিকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছে। আবেগঘন সুর, বিলাপধর্মী পরিবেশনা ও বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে এ গানে ফুটে ওঠে শোক, ত্যাগ ও মানবতার নানা দিক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জারি গানে যুক্ত হয়েছে সামাজিক ঘটনা ও জনজীবনের নানা চিত্রও।
বাংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে মিশে থাকা এ লোকজ সংগীত দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই জারি গানের চর্চা অব্যাহত রাখা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এ ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের প্রত্যাশা, কাকচর পশ্চিমপাড়ার এ আয়োজনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা লোকসংস্কৃতি আবারও প্রাণ ফিরে পাবে।
পড়ুন : গাজীপুরের শ্রীপুরে ভাড়া বাসা থেকে যুবকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার


