মাদারীপুর সদর উপজেলার কুনিয়া ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগ ঘিরে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রয়োজনীয় গুদাম, পরিবহন-সুবিধা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থাকার দাবি করেও কয়েকজন আবেদনকারী ডিলারশিপ না পাওয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন বাছাইপ্রক্রিয়া নিয়ে। অন্যদিকে, ডিলারশিপ পাওয়া লাভলু হাওলাদারের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও পারিবারিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। উঠেছে আর্থিক লেনদেন ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও।এমনকি তিনি ঢাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য করেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মাদারীপুর জেলার ৫৯টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভায় সার ডিলার নিয়োগের জন্য ৫৬৩ জন আবেদন করেন। যাচাই-বাছাই শেষে ৬৩ জনের সুপারিশের তালিকা জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটিতে পাঠানো হয়। পরে মন্ত্রণালয় তালিকাটি অনুমোদন দেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
যুবলীগ নেতার চাচা, বিএনপি সভাপতির ফুফাতো ভাই—তবু বিতর্ক কেন?
জানা গেছে, ডিলারশিপ পাওয়া লাভলু হাওলাদার কুনিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক এম রুহুল আমিন হাওলাদার
শিমুলের চাচা এবং ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সালাম হাওলাদারের ফুফাতো ভাই। তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও পারিবারিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপির একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, লাভলু হাওলাদারের সঙ্গে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা ছিল। এ অবস্থায় তাঁর আবেদন যাচাইয়ের সময় রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো কতটা গুরুত্ব পেয়েছে, তা প্রকাশ করা উচিত।লাভলু হাওলদার দীর্ঘদিন ঢাকায় ছিলেন এখনো সে ঢাকায় আছেন তার ব্যবসা-বাণিজ্য সব ঢাকায়। কোনমতেই ডিলার পাওয়ার যোগ্য না। সে অনৈতিক উপায়ে ডিলার পেয়েছেন বলে মন্তব্য করেন আবেদনকারীর এক অংশ।
মান ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থাকার দাবি, তবু বাদ
ডিলারশিপের আবেদনকারী সরোয়ার হোসেনের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় গুদাম ও গাড়ি রাখার জায়গা থাকার পরও তিনি নির্বাচিত হননি।
তিনি বলেন, “আমার বড় গোডাউন আছে, গাড়ি রাখার জায়গা আছে—প্রয়োজনীয় সবকিছুই রয়েছে। প্রকৃতভাবে যাচাই-বাছাই করলে আমি ডিলারশিপ পেতাম বলে মনে করি। কিন্তু লাভলু হাওলাদার কীভাবে ডিলার হলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।”
সরোয়ারের অভিযোগ, প্রভাব খাটিয়েই লাভলু ডিলারশিপ পেয়েছেন। তাঁর দাবি, লাভলু দীর্ঘদিন ঢাকায় ব্যবসা করেছেন। এ কারণে তাঁর বর্তমান ব্যবসায়িক অবস্থান, স্থানীয় পর্যায়ে সার বিতরণের সক্ষমতা এবং নিয়োগের শর্ত পূরণের বিষয়গুলো যাচাই করা প্রয়োজন।
নাম প্রকাশ্য অনিচ্ছুক একই ধরনের অভিযোগ করেছেন একাধিক আবেদনকারীরা তাদের দাবি, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচিত ব্যক্তির যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
কুনিয়া ইউনিয়নের আরেক আবেদনকারী মো. জাহাঙ্গীর মাতুব্বর জানান, নিজস্ব গুদাম ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থাকার পরও তিনি ডিলারশিপ পাননি। তাঁর অভিযোগ, অন্য আবেদনকারীদের কেউ কেউ ভাড়া করা গুদাম দেখিয়েও নিয়োগ পেয়েছেন।
অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কোথায়?
ডিলার নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বিএনপির একাংশের কয়েকজন নেতাকর্মী। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে থাকা অনেক নেতাকর্মী ডিলারশিপ পাননি। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে তাঁরা দাবি করেন, এমন একজন ব্যক্তি ডিলারশিপ পেয়েছেন।
অভিযোগকারীদের কেউ কেউ অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ দেওয়ার কথাও বলেছেন। এ ছাড়া বাদ পড়া আবেদনকারীদের একাংশের দাবি, প্রভাবশালী মহলের পছন্দের ব্যক্তিদের নাম সুপারিশের তালিকায় স্থান পেয়েছে।
লাভলুর দাবি: ‘আমি বিএনপির সঙ্গে জড়িত ছিলাম’
অভিযোগের বিষয়ে লাভলু হাওলাদার দাবি করেন, তিনি দীর্ঘদিন বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁর ভাষ্যমতে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রায় ১৭ বছর তিনি দেশের বাইরে ছিলেন এবং সে সময় দেশে ফিরতে পারেননি। বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণেই তিনি সার ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।এবং যুবলীগ নেতা তার দূর সম্পর্কের আত্মীয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ছাত্রদল ও বিএনপি নেতাদের ক্ষোভ, পুনঃতদন্তের দাবি
ডিলার নিয়োগের তালিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মাদারীপুর জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, “দীর্ঘ ১৭ বছর জেল-জুলুম, নির্যাতন সহ্য করে অনেক ত্যাগী কর্মী পথে বসে গেছে। অন্যদিকে লাভলু হাওলাদারের মতো ফ্যাসিস্টরা টাকার কুমির হয়েছে। এই সময়েও যদি তারাই অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ পায়, সেটা দুঃখজনক।”
তালিকা প্রকাশের পর মাদারীপুর সদর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক গাউছ-উর রহমান বলেন, কুনিয়া ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগে অনিয়ম হয়ে থাকলে পুনরায় তদন্ত করে যোগ্য ব্যক্তিদের হাতে ডিলারশিপ তুলে দেওয়া উচিত।
তবে এ বিষয়ে কুনিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সালাম হাওলাদার বলেন, সে তার যোগ্যতায় পেয়েছে। এখানে আমি তাকে কেন সুপারিশ করব আমি তাকে সুপারিশ করিনি। সে আমার মামাতো ভাই হয়। এটা উপরের কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত এখানে আমার কোন সিদ্ধান্ত না।
কৃষি কর্মকর্তাদের বক্তব্যে প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
ডিলার নিয়োগের বাছাইপ্রক্রিয়া নিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব দীপ্তি রানী সরকার বলেন, “প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে নীতিমালা অনুযায়ী যাচাই-বাছাই করে আগ্রহী প্রার্থীদের নাম প্রস্তাব করে জেলা কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে।”
অন্যদিকে, জেলা কৃষি কর্মকর্তা রহিমা খাতুন জানান, তিনি যাচাই-বাছাই কমিটিতে ছিলেন না। তাঁর বক্তব্য, ওপর থেকে যাচাই-বাছাই করে যে তালিকা পাঠানো হয়েছে, তাঁরা সেটিই পাঠিয়েছেন। অনিয়ম থাকলে অভিযোগের ভিত্তিতে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাকিয়া সুলতানা বলেন, “স্বচ্ছতার সঙ্গে সুপারিশ করা হয়েছে। এটি নিয়োগ কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।”এর আগে তিনি বলেন, অনিয়মের বিষয়টি তাঁর জানা নেই। এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পড়ুন : আজ জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
সা/


