ভালোবাসার মানুষের প্রতি ছিল অগাধ বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসের হাত ধরেই, বিয়ের রঙিন স্বপ্ন নিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন ১৯ বছরের এক তরুণী। সেই স্বপ্ন যে অচিরেই ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে রূপ নেবে, তা হয়তো তিনি ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেননি। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ডেকে নিয়ে তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং সেই দৃশ্য ভিডিও করে ব্ল্যাকমেইল করার মতো লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায়।
তবে ঘটনার পরপরই ভুক্তভোগীর সাহসিকতা এবং পুলিশের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে রবিবার (২৫ অক্টোবর) ভোরে অভিযুক্ত প্রেমিকসহ তিন যুবককে গ্রেফতার করেছে কেন্দুয়া থানা পুলিশ।
ভুক্তভোগী তরুণীর দায়ের করা এজাহার থেকে জানা যায়, ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ভুক্তভোগী তরুণীর সাথে গত এক বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল কেন্দুয়ার চিরাং ইউনিয়নের কাশীপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামের মঙ্গল মিয়ার ছেলে মো. বিল্লাল মিয়ার (২২)।
গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে প্রেমিক বিল্লাল তার মোবাইল থেকে কল করে ওই তরুণীকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে ঈশ্বরগঞ্জ বাজারে চলে আসতে বলে। ভালোবাসার মানুষের কথায় বিশ্বাস করে তরুণী তার বাবার ড্রয়ার থেকে ১২ হাজার টাকা নিয়ে দুপুর পৌনে ২টার দিকে ঈশ্বরগঞ্জ বাজারে পৌঁছান। সেখান থেকে সিএনজিযোগে বিকেল ৩টা ১০ মিনিটে তিনি কেন্দুয়া বাসস্ট্যান্ডে আসেন। বিল্লাল সেখান থেকে তাকে রিসিভ করে প্রথমে তার বড় ভাইয়ের খালি বাসায় নিয়ে যায় এবং রাত ৯টার দিকে সেখান থেকে বের করে বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করতে থাকে।
ঘোরাঘুরির একপর্যায়ে রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে বিল্লাল ওই তরুণীকে চিরাং ইউনিয়নের কাশীপুর গ্রামের ঈদগাহ মাঠের মিনারের কাছে নিয়ে যায়। সেখানে আগে থেকেই ওত পেতে ছিল বিল্লালের দুই সহযোগী- একই এলাকার রুস্তম মিয়ার ছেলে হারুন মিয়া (২৭) এবং এখলাস মিয়ার ছেলে মো. রুবেল মিয়া (২৬)।
তরুণী সেখানে পৌঁছানো মাত্রই বিল্লালের ওই দুই বন্ধু তাকে ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করে। একপর্যায়ে রুবেল মিয়া তরুণীর মুখে গামছা চেপে ধরে এবং হারুন তাকে জোরপূর্বক মাটিতে শুইয়ে ফেলে। রুবেল হাত-পা চেপে ধরে রাখলে, তরুণীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে হারুন তাকে ধর্ষণ করে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়টি হলো, যখন এই পাশবিক নির্যাতন চলছিল, তখন কথিত প্রেমিক বিল্লাল বাধা দেওয়ার বদলে তার মোবাইল ফোনে ধর্ষণের সেই দৃশ্য ভিডিও ধারণ করছিল।
নির্যাতনের এক পর্যায়ে সুযোগ পেয়ে তরুণী জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করে ঘটনা জানান। সেখান থেকে কেন্দুয়া থানার নম্বর এসএমএস করে দেওয়া হয়। তরুণী যখন ওই নম্বরে কল করার চেষ্টা করছিলেন, তখন বিল্লাল ক্ষিপ্ত হয়ে ফোনটি কেড়ে নেয় এবং সিম কার্ডটি ভেঙে ফেলে। এরপর বিল্লাল নিজেও তার বন্ধুদের সহায়তায় ওই তরুণীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে।
পৈশাচিক এ ঘটনার পর অভিযুক্তরা তরুণীকে হুমকি দেয়, ঘটনার কথা কাউকে জানালে বা মামলা করলে ধারণকৃত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন রাস্তার পাশে থাকা সেচ পাম্পের বিদ্যুতের আলোতে তরুণী অভিযুক্তদের স্পষ্টভাবে চিনে রাখেন। রাত ১২টা ১০ মিনিটে তারা তরুণীকে অটোরিকশায় তুলে দেয়। তরুণী কেন্দুয়া বাজারে নেমে পায়ে হেঁটে থানায় পৌঁছান এবং পরিবারের সাথে পরামর্শ করে অভিযোগ দায়ের করেন।
এ বিষয়ে কেন্দুয়া থানার তদন্ত কর্মকর্তা সজল সরকার জানান, ভুক্তভোগী তরুণীর অভিযোগ পাওয়া মাত্রই পুলিশ কালক্ষেপণ না করে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। রবিবার ভোরে কাশীপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রধান অভিযুক্ত প্রেমিক বিল্লাল হোসেন এবং তার সহযোগী হারুন মিয়া ও রুবেল মিয়াকে আটক করা হয়।
তিনি আরও জানান, ভুক্তভোগী তরুণী বর্তমানে থানা হেফাজতে নিরাপদে রয়েছেন এবং আসামিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
সাধারণত এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগীরা সম্মানহানির ভয়ে অনেক সময় চুপ থাকেন। এই তরুণীর তাৎক্ষণিক সাহসিকতা এবং পুলিশের দ্রুত সাড়াদানের কারণে অপরাধীরা দ্রুত আইনের আওতায় এসেছে, যা সমাজে ইতিবাচক বার্তা বহন করবে। সচেতন মহল মনে করছেন, আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের সামাজিক অবক্ষয় ও নারী নির্যাতনের ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে।
পড়ুন : দুই সপ্তাহ পর খুলছে রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দর
সা/


