নেত্রকোনার ধনু নদে অবৈধ ঘের: বিপন্ন জেলে, ব্যাহত নৌ-চলাচল

হাওরের বুক থেকে পানি নামতে শুরু করলেই যেন রূপ বদলায় নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে চলা ধনু নদ। তবে এই রূপ প্রকৃতির কোনো আশীর্বাদ নয়, বরং প্রভাবশালী মহলের আগ্রাসনের। নদের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বাঁশ আর জালের বিশাল দেয়াল তুলে তৈরি করা হয়েছে সারি সারি মাছের ঘের। নদের দুই পাড় থেকে একেবারে মাঝনদী পর্যন্ত বিস্তৃত এসব ঘেরের কারণে একদিকে যেমন থমকে যাচ্ছে পণ্যবাহী নৌযান, অন্যদিকে পৈতৃক পেশা হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে শত শত প্রান্তিক জেলের।

খালিয়াজুরীর লেপসিয়া থেকে গাজীপুর ইউনিয়নের পাঁচহাট- ধনু নদের দীর্ঘ জলপথ এখন অনেকটাই অবৈধ ঘেরমালিকদের দখলে। স্থানীয় জেলেদের জন্য এই নদ শুধু জলের আধার নয়, বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। সেই জলেই এখন তাদের নামতে বাধা।

নুরালীপুর গ্রামের জেলে রহিছ, রাকিব ও জিলকদ মিয়ারা ক্ষোভ আর হতাশা নিয়ে জানালেন তাদের নিত্যদিনের সংগ্রামের কথা। বর্ষা মৌসুমে হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে ইজারাদারদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল তাদের। ভেবেছিলেন, পানি কমলে অন্তত নদে মাছ ধরে সংসার চালাবেন। সেখানেও এখন অলিখিত নিষেধাজ্ঞা। ঘেরের আশপাশে মাছ ধরতে গেলেই তেড়ে আসেন মালিকেরা, কখনো কখনো জুটছে শারীরিক নির্যাতনও।

খালিয়াজুরী সদরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলের কণ্ঠে যেন পুরো জেলেপল্লিরই হাহাকার ঝরে পড়ল। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। নদীতে মাছ ধরে কোনোমতে সংসার চালাই। এখন নদীতেও যদি মাছ ধরতে না দেয়, পরিবার-পরিজন নিয়ে বাঁচব কীভাবে? আমাদের কথা শোনার যেন কেউ নেই এ দেশে।”

জেলেদের অভিযোগ, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নদের দখলদারদের মুখ বদলায় ঠিকই, কিন্তু আধিপত্যের চিত্রটি একই থাকে। প্রভাবশালীরা নদের বুকে নতুন করে সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন, আর বঞ্চিত হন প্রকৃত জেলেরা।

শুধু জীবিকাই নয়, জালের ঘেরাটোপে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে ধনু নদের নৌ-চলাচল। নদীপথে বাল্কহেড, কার্গোসহ পণ্যবাহী বড় বড় নৌযান প্রতিনিয়ত চলাচল করে। ঘেরের বাঁশ আর জালের বিস্তৃতি মাঝনদী পর্যন্ত চলে আসায় যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

নদীপথে চলাচলকারী এমভি সৌরভ নামের এক নৌযানের সারেং মো. সুলাইমান সওদাগর বলেন, “নদীর দুই পাড় থেকে ঘেরের বেড়া যেভাবে মাঝনদী পর্যন্ত চলে এসেছে, তাতে আমাদের নৌযান চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে। বিশেষ করে পণ্যবোঝাই ভারী নৌযান নিয়ে পার হওয়ার সময় চরম আতঙ্কে থাকতে হয়।”

আসদপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. তোফাজ্জলের মতে, এটি কেবল নৌ-চলাচলের সংকট নয়, পরিবেশেরও বড় বিপর্যয়। তিনি বলেন, “অবৈধভাবে নদের বুকে এভাবে কাঠামো তোলায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে নদের নাব্যতা ও পরিবেশ দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” লেপসিয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ঠিক সামনেই দিনের বেলায় কীভাবে এসব ঘের তৈরি হচ্ছে, তা নিয়েও বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি।

সরকারি কোনো অনুমতি তো দূরের কথা, নদের বুকে ঘের তৈরি করা যে বেআইনি, তা তোয়াক্কাই করছেন না ঘেরমালিকরা। আসদপুর গ্রামের হোসেন মিয়া নিজের বাড়ির সামনে ধনু নদে ঘের দিয়েছেন। কার অনুমতি নিয়েছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি অবলীলায় বলেন, “নিজের ইচ্ছাতেই দিয়েছি।” নৌ-চলাচলে সমস্যার বিষয়ে তার যুক্তি আরও অদ্ভুত, “আমি ছাড়া আরও অনেকেই তো দেয়, তাই আমিও দিয়েছি।”

ঘের পরিচালনায় কাউকে ম্যানেজ করতে হয় কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে হোসেন মিয়া বিস্ফোরক তথ্য দেন। তিনি দাবি করেন, মাছ ধরার সময় নৌ-পুলিশের লোকজন এসে মাছ নিয়ে যায় এবং তারা স্বেচ্ছায় সেই মাছ তাদের দিয়ে দেন।

মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০ এবং মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৮৫-এর বিধি ৪ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম ছাড়া নদ-নদী, খাল বা বিলে আড়াআড়ি বাঁধ নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।

তবে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। লেপসিয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জগত জ্যোতি চৌধুরী বলেন, “বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকায় এদিকে নজর দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে অচিরেই এসব ঘেরের বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হবে।” ঘেরমালিকদের কাছ থেকে মাছ নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তার চ্যালেঞ্জিং জবাব, “এ ধরনের কোনো অভিযোগ থাকলে আপনারা নিউজ করে দেন।”

অন্যদিকে, খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অলিদুজ্জামান জানিয়েছেন, সামাজিকভাবে বিষয়টি তার নজরে এলেও আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি এখনো অবগত নন। তবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, “নদীর গতিপথ অনেক সময় পরিবর্তিত হয়। ঘেরের জায়গাগুলো জলমহালের অংশ কি না, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। লেপসিয়া থেকে পাঁচহাট পর্যন্ত অবৈধ ঘেরগুলোর সত্যতা পেলেই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।”

প্রশাসনের আশ্বাস যেন শুধু আশ্বাসের বৃত্তেই আটকে না থাকে, সেটাই এখন স্থানীয়দের প্রত্যাশা। ধনু নদের প্রবাহকে বাঁধামুক্ত করতে এবং শত শত জেলের মুখের হাসি ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ও দ্রুত পদক্ষেপই পারে এই সংকটের সমাধান করতে। নদের জল সবার জন্য উন্মুক্ত হোক, এটাই এখন খালিয়াজুরীর সাধারণ মানুষের প্রাণের দাবি।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে মৎস্য প্রকল্পের খুঁটি-তার সরানোর অভিযোগ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন