আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ বক্তব্যের প্রেক্ষাপট জানাল পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন

দিনশেষে প্রতিটি মানুষ যখন নিরাপদে ঘরে ফেরার স্বস্তি খোঁজেন, তখন রাজপথে কিংবা অলিগলিতে নির্ঘুম প্রহরায় থাকেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ দমন এবং সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের প্রায়শই মুখোমুখি হতে হয় চরম বৈরী পরিস্থিতির। সন্ত্রাসী ও সংঘবদ্ধ অপরাধীদের অতর্কিত হামলায় কখনো ঝরে যায় প্রাণ, কখনো বা পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের। মাঠপর্যায়ের রূঢ় বাস্তবতা, পুলিশ সদস্যদের আত্মরক্ষার আইনি অধিকার এবং অপরাধ দমনে বাহিনীর দৃঢ় অবস্থানের প্রেক্ষাপট থেকেই পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সংগঠনের সভাপতি কামরুল হাসান তালুকদার এবং সাধারণ সম্পাদক মনিরুল হক ডাবলু বিবৃতিতে আইজিপির বক্তব্যের প্রকৃত প্রেক্ষাপট ও মাঠপর্যায়ের পুলিশের ঝুঁকির চিত্র তুলে ধরা হয়।

গত ২৬ অক্টোবর রাজধানীর চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং শাখা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির। তার সেই বক্তব্যে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়, যা বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।

সংগঠনটি তাদের ব্যাখ্যায় স্পষ্ট করেছে, আইজিপির বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পুলিশের আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও সক্ষমতার বিষয়টি সামনে আনা। মূলত অপরাধ দমনে পুলিশের অনড় ও দৃঢ় অবস্থান বোঝাতেই তিনি ওই শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তার এই বক্তব্যকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘোষণা কিংবা আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে কাউকে শাস্তি দেওয়ার বার্তা হিসেবে না দেখে, সামগ্রিক প্রেক্ষাপট থেকে বিবেচনা করার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন।

পুলিশ সদস্যরা কতটা প্রতিকূল ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে দায়িত্ব পালন করেন, তার পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়েছে বিবৃতিতে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসেই পুলিশের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় দায়িত্ব পালনকালে চারজন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ৩৭০ জন সদস্য।

সাম্প্রতিক দুটি ঘটনার উদাহরণ টেনে বিবৃতিতে বলা হয়, গত ২৪ অক্টোবর গোপালগঞ্জের বেদগ্রাম খেয়াঘাট এলাকায় মিছিল থেকে পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে, যাতে তিনজন পুলিশ সদস্য আহত হন। এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০টার দিকে টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় পুলিশের ওপর পাথর নিক্ষেপ করে হাতকড়াসহ এক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে; এতেও একজন পুলিশ সদস্য আহত হন।

পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন জানায়, চরম ঝুঁকিপূর্ণ এসব পরিস্থিতিতেও পুলিশ সদস্যরা কোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার না করে সর্বোচ্চ সংযমের পরিচয় দিয়েছেন। তবে দায়িত্ব পালনকালে বারবার এমন হামলার শিকার হলে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর এ কারণেই পুলিশ সদস্যদের জীবন রক্ষা, সরকারি সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আত্মরক্ষার অধিকার এবং অপরাধ দমনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করে সংগঠনটি।

আত্মরক্ষার বিষয়টি কেবল তাৎক্ষণিক প্রয়োজনই নয়, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনেও এটি স্বীকৃত। বিবৃতিতে আইনি দিকগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়, ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৯৬ থেকে ১০৬ ধারা, ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৭ ও ১২৮ ধারা এবং পুলিশ প্রবিধানে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে প্রাসঙ্গিক ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন এটিও মনে করে, পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকার ও দায়িত্ব পালনের ঝুঁকি যেমন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার, ঠিক তেমনি দেশে আইনের শাসন, মানবাধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।

চকবাজারের ওই একই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বিষয়ে আইজিপির করা মন্তব্য নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সে বিষয়েও নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির মতে, কোনো মন্তব্যের বিচ্ছিন্ন অংশের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছালে মূল বা প্রকৃত বক্তব্য সম্পর্কে জনমনে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। তাই বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট যাচাই করে বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সংবাদ প্রকাশের জন্য গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বিবৃতির শেষাংশে পুলিশ ও গণমাধ্যমের সম্পর্ককে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, উভয় পক্ষই মূলত জনস্বার্থে কাজ করে। পুলিশ অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করে, আর গণমাধ্যম জনগণের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেয়। তাই একে অপরের পেশাগত দায়িত্ব ও বাস্তবতাকে অনুধাবন করা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। পুলিশ ও গণমাধ্যমের পারস্পরিক সহযোগিতাই জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশ্বাস করে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন।

পড়ুন : জামায়াত ক্ষমতায় আসলে, মা-বোনেরা ইজ্জত নিয়ে নিরাপদে চলাফেরা করতে পারত না: এমপি খোকন তালুকদার

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন