রাজধানীর নিকুঞ্জে সড়ক ও ফুটপাতের অবৈধ দখল নিয়ে জনভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। বারবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও কিছুদিনের মধ্যে আবারও দখল ফিরে আসার অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নিকুঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ফুটপাত ও সরকারি জায়গায় গড়ে ওঠা সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছে নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি।
সোসাইটির দাবি, শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; উচ্ছেদের পর সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো যাতে পুনরায় দখল না হয়, সে জন্য কার্যকর ও স্থায়ী নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জনসাধারণের চলাচলের পথ দখল করে ব্যবসা পরিচালনার প্রবণতা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিকুঞ্জের বিভিন্ন সড়ক ও ফুটপাতের উল্লেখযোগ্য অংশে ভাসমান দোকান, হকার ও অন্যান্য স্থাপনার কারণে পথচারীদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে পথচারীদের মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধীদের চলাচলে ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) বিভিন্ন সময়ে নিকুঞ্জে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করেছে। গত ১৭ নভেম্বর ২০২৫ নিকুঞ্জ-২-এর ১ নম্বর সড়ক এবং খেলার মাঠসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। পরবর্তী সময়েও এলাকাটিতে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
চলতি বছরের ২১ জুন নিকুঞ্জ-২-এর ১/এ নম্বর সড়কে অভিযান চালিয়ে সড়ক ও ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এসব অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে উচ্ছেদের পর পুনর্দখল ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি না থাকায় সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হয়নি।
সোসাইটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বারবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পরও ফুটপাতের দখল পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। একদিকে প্রশাসন উচ্ছেদ করছে, অন্যদিকে কিছু দখলদার আবারও আগের অবস্থানে ফিরে আসছে। এভাবে উচ্ছেদ ও পুনর্দখলের চক্র চলতে থাকলে জনদুর্ভোগের অবসান হবে না।
সোসাইটির অভিযোগ, নিকুঞ্জের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ড ও পরিচয়ের আড়ালে জনসাধারণের চলাচলের জায়গা দখল করে রাখার অভিযোগ রয়েছে। এসব দখল নিয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ অসৌজন্যমূলক আচরণ ও হুমকির মুখে পড়েন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
সোসাইটির বক্তব্য, সড়ক ও ফুটপাত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এগুলো জনসাধারণের চলাচলের জন্য নির্ধারিত। তাই রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব যা-ই থাকুক, জনস্বার্থবিরোধী অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
যেসব এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান জরুরি
নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির দাবি অনুযায়ী, নিকুঞ্জের যেসব স্থানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. নিকুঞ্জ-১-এর ২ নম্বর গেট: বিআরটিসি-সংলগ্ন প্রবেশপথের পাশে অন্তত এক ডজন অবৈধ দোকান রয়েছে বলে অভিযোগ। গুরুত্বপূর্ণ এই প্রবেশপথের সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়েছে সোসাইটি।
২. নিকুঞ্জ-২-এর ১ নম্বর সড়ক ও বটতলা: সড়ক ও ফুটপাতের ওপর থাকা অবৈধ দোকানপাট ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে পথচারীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
৩. পেট্রোবাংলার উত্তর-পশ্চিম পাশের এলাকা: এ এলাকার সড়ক ও ফুটপাতের দখল পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি রয়েছে।
৪. নিকুঞ্জ-২-এর ১/এ নম্বর সড়ক: আগেও এ সড়কে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু অভিযানের সুফল স্থায়ী করতে নিয়মিত নজরদারি ও পুনর্দখল প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছে সোসাইটি।
৫. রাজউকের পেছনের কবি ফররুখ সরণি: সড়ক ও ফুটপাতের স্বাভাবিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এলাকাটিতে দখল পরিস্থিতি যাচাই করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের দাবি জানানো হয়েছে।
৬. নিকুঞ্জ মাঠের চারপাশ: এলাকার একমাত্র খেলার মাঠের চারপাশে হকার ও দোকানপাটের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে সোসাইটি। তাদের অভিযোগ, প্রতিদিন একটু একটু করে মাঠসংলগ্ন জায়গা দখল হয়ে যাচ্ছে। এতে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার পরিবেশ ও মাঠের স্বাভাবিক ব্যবহার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
৭. নিকুঞ্জের ১৩ নম্বর সড়কের মোড় থেকে সিটি হসপিটাল পর্যন্ত: এ সড়কের বড় অংশে হকারদের ব্যবসার কারণে চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। সড়ক ও ফুটপাতের প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ দখল অপসারণের দাবি জানানো হয়েছে।
সোসাইটির মতে, এসব এলাকায় সমন্বিতভাবে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলে পথচারীদের চলাচল সহজ হবে, সড়কের ব্যবহারযোগ্যতা বাড়বে এবং আবাসিক এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
উচ্ছেদের পর পুনর্দখল ঠেকানোই বড় চ্যালেঞ্জ
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার চেয়ে উচ্ছেদের সুফল ধরে রাখা আরও বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, উচ্ছেদের পর নিয়মিত তদারকি না থাকলে আগের দখলদারদের ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে সরকারি অর্থ ও প্রশাসনিক শ্রম ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সোসাইটি কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
উচ্ছেদের পর সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোর নিয়মিত পরিদর্শন।
দখলমুক্ত সড়ক ও ফুটপাতের ছবি এবং অবস্থান নথিভুক্ত করে পর্যবেক্ষণ।
পুনর্দখলের চেষ্টা দেখা দিলে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
প্রয়োজন অনুযায়ী সিসিটিভি, নিয়মিত টহল ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সমন্বয়ে পর্যবেক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা।
বৈধ ব্যবসা ও অবৈধ দখলের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।
সোসাইটির মতে, এসব ব্যবস্থা বাস্তবায়নের উপযুক্ত পদ্ধতি নির্ধারণে ডিএনসিসি, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
ডিএনসিসির ঘোষণার বাস্তবায়ন চান নিকুঞ্জবাসী
ফুটপাত দখলমুক্ত করার বিষয়ে ডিএনসিসির সাম্প্রতিক অবস্থানও নিকুঞ্জবাসীর প্রত্যাশাকে জোরালো করেছে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান ঘোষণা দেন, জনসাধারণের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পরিচালনার বিরুদ্ধে আগাম নোটিশ ছাড়াই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। পরবর্তী সময়েও তিনি দখলমুক্ত ফুটপাত পুনরায় দখল করা হলে কঠোর অভিযান অব্যাহত রাখার কথা বলেছেন।
পড়ুন : ডেঙ্গুতে একদিনে রেকর্ড ১১ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ২০৭১


