পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত বক্তব্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনার পর ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। আইজিপির বক্তব্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করে না উল্লেখ করে পুলিশ বলেছে, আইন প্রয়োগে কঠোরতা এবং দায়িত্ব পালনের সময় আত্মরক্ষার বিষয়টি বোঝাতেই শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
সোমবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ ব্যাখ্যা দেয় পুলিশ সদর দপ্তর। রাজধানীতে কমিউনিটি ব্যাংকের চকবাজার ইসলামিক ব্যাংকিং শাখার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইজিপির বক্তব্য এবং এ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে বিভ্রান্তি দূর করতে বিজ্ঞপ্তিটি দেওয়া হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরেছিলেন আইজিপি। তবে বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে কাউকে শাস্তি দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্য তাঁর বক্তব্যে ছিল না।
পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের প্রায়ই প্রাণঘাতী হামলার মুখে পড়তে হয়। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে সারা দেশে পুলিশের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় চারজন পুলিশ সদস্য নিহত এবং ৩৭০ জন আহত হয়েছেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
এতে আরও বলা হয়, দণ্ডবিধি-১৮৬০, ফৌজদারি কার্যবিধি-১৮৯৮ এবং পুলিশ অ্যাক্ট-১৮৬১ অনুযায়ী দায়িত্ব পালনকালে আত্মরক্ষার আইনি অধিকার রয়েছে পুলিশ সদস্যদের। একই সঙ্গে মানবাধিকার সমুন্নত রেখে পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশ পুলিশের অঙ্গীকারের কথাও জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের উদ্দেশে আইজিপির করা মন্তব্য প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে ঢালাও মন্তব্য করার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। বিষয়টি অসাবধানতাবশত ঘটেছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তরুণ ব্যবসায়ী সুজন মিয়া বলেন, আইজিপি সরকারের অনুমোদনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন; তিনি সরাসরি পুলিশ ক্রসফায়ার করবে—এমন ঘোষণা দেননি বলে তাঁর মত। এ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা ও সমালোচনার বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
একটি জাতীয় গণমাধ্যমের জেলা প্রতিনিধি সাইয়েদ আহমেদ বলেন, আইজিপির বক্তব্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হলে অপরাধীরা উৎসাহিত হতে পারে। তাঁর মতে, সন্ত্রাস ও মাদক কারবারের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থান প্রয়োজন।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা আবুল হোসেন বলেন, পুলিশ ঝুঁকি নিয়ে আসামি গ্রেপ্তার করলেও আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। তাঁর মতে, অপরাধ দমনে আইন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবীণ শিক্ষকও মনে করেন, আইজিপির বক্তব্য নিয়ে বিভিন্ন কারণে অপব্যাখ্যা হচ্ছে। তাঁর মতে, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশসহ সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়িত্বশীল ও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে।
তবে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ঘিরে বিতর্কের মধ্যে আইন প্রয়োগে কঠোরতা, আত্মরক্ষার অধিকার এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্ব—এই তিনটি বিষয়ই আলোচনায় এসেছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইনের শাসন ও মানবাধিকার সমুন্নত রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্ট মহলের আলোচনায় উঠে এসেছে।
পড়ুন : খুলনায় একদিনে তিনজনকে গুলি, আহত দুই যুবদল নেতা


