ইংলিশ ফুটবলে বড় অঘটনের শিকার হয়েছে আর্সেনাল। চতুর্থ সারির ক্লাব ফ্লিটউড টাউনের কাছে টাইব্রেকারে হেরে ইংলিশ ফুটবল লিগ কাপ (ইএফএল কাপ) থেকে বিদায় নিয়েছে গানাররা। নির্ধারিত সময়ে ১-১ গোলে ড্র হওয়ার পর টাইব্রেকারে ৫-৩ ব্যবধানে জয় পায় ফ্লিটউড। বর্তমান প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে এই জয় ক্লাবটির ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে।
এভারটনের বিপক্ষে ২-০ গোলের জয় নিয়ে ম্যাচটিতে খেলতে নেমেছিল আর্সেনাল। তবে কোচ মিকেল আরতেতা একাদশে নয়টি পরিবর্তন আনেন। দলের নিয়মিত খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দিয়ে বিকল্প ও তরুণ ফুটবলারদের সুযোগ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত আর্সেনালের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। ম্যাচের শুরু থেকে বলের দখল ও আক্রমণে এগিয়ে থেকেও চতুর্থ বিভাগের প্রতিপক্ষের বিপক্ষে জয় তুলে নিতে পারেনি লন্ডনের ক্লাবটি।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে ফ্লিটউড টাউন টুর্নামেন্টের ইতিহাসে বিশেষ কীর্তি গড়েছে। বর্তমান ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়নদের লিগ কাপ থেকে বিদায় করা চতুর্থ সারির প্রথম দল হিসেবে নিজেদের নাম লিখিয়েছে তারা। অন্যদিকে, আর্সেনালের জন্য এটি বড় ধাক্কা। এর আগে ২০১২-১৩ মৌসুমে চতুর্থ সারির ব্র্যাডফোর্ড সিটির কাছে টাইব্রেকারে হেরে লিগ কাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল গানারদের।
ম্যাচের শুরুতেই ঘটে অপ্রত্যাশিত ঘটনা। খেলা শুরুর মাত্র এক মিনিট পর স্টেডিয়ামের ওপর একটি ড্রোন উড়তে দেখা যায়। নিরাপত্তার কারণে রেফারি খেলা বন্ধ রাখতে বাধ্য হন। আট মিনিটেরও বেশি সময় বন্ধ থাকার পর আবার শুরু হয় ম্যাচ।
খেলা পুনরায় শুরু হওয়ার পর আর্সেনাল বলের দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে। তবে স্বাগতিক ফ্লিটউডও সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তাদের সংগঠিত রক্ষণ এবং পাল্টা আক্রমণের পরিকল্পনা শুরু থেকেই কার্যকর দেখা যায়।
ম্যাচের ২১ মিনিটে সেই পরিকল্পনার সুফল পায় ফ্লিটউড। আর্সেনালের তরুণ ডিফেন্ডার মার্লি সলমনের ভুলের সুযোগ কাজে লাগান ফুলহ্যাম থেকে ধারে খেলতে আসা অ্যারন লুপালো-বি। দারুণ এক শটে আর্সেনালের গোলরক্ষক ইলান মেসলিয়েরকে পরাস্ত করে স্বাগতিকদের এগিয়ে দেন তিনি। গোলের পর স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন ফ্লিটউডের খেলোয়াড় ও সমর্থকেরা।
অন্যদিকে, পিছিয়ে পড়ার পর আর্সেনাল গোল শোধের চেষ্টা চালালেও প্রথমার্ধে সমতা ফেরাতে পারেনি। একাদশে ব্যাপক পরিবর্তনের প্রভাব দলের আক্রমণভাগে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিরতির সময় পরিস্থিতি বদলাতে উদ্যোগী হন আরতেতা। দলের অভিজ্ঞ দুই খেলোয়াড় মার্টিন ওডেগার্ড ও বেন হোয়াইটকে মাঠে নামান তিনি। এই পরিবর্তনের সুফল দ্রুতই পায় আর্সেনাল।
দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরুর মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায় সমতা ফেরান ভিক্টর গিয়োকেরেস। কেডাচ ও’নেলের চমৎকার ক্রস থেকে পাওয়া বল জালে পাঠিয়ে দলকে ম্যাচে ফেরান তিনি। গোলের পর আর্সেনালের খেলোয়াড়েরা ব্যবধান বাড়ানোর জন্য আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন।
সমতা ফেরানোর পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই নিজেদের হাতে নেয় গানাররা। বলের দখল ধরে রেখে একের পর এক আক্রমণ তৈরি করলেও ফ্লিটউডের রক্ষণ ভাঙতে পারেনি তারা। স্বাগতিকদের গোলরক্ষক ও রক্ষণভাগও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দৃঢ়তা দেখায়। ফলে ম্যাচের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগে আর কোনো গোল হয়নি।
ম্যাচের ৮৫ মিনিটে আর্সেনালের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ফ্লিটউডের হ্যারিসন নীলকে ফাউল করায় সরাসরি লাল কার্ড দেখেন ১৬ বছর বয়সী তরুণ ফুটবলার ম্যাক্স ডোভান। ফলে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ১০ জন নিয়ে খেলতে হয় গানারদের।
একজন খেলোয়াড় কমে যাওয়ায় আক্রমণে চাপ বাড়ানো এবং প্রতিপক্ষের পাল্টা আক্রমণ সামলানো—দুই ক্ষেত্রেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে আর্সেনাল। তারপরও নির্ধারিত সময়ে আর কোনো দল গোল করতে না পারায় ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য টাইব্রেকারের আশ্রয় নেওয়া হয়।
টাইব্রেকারে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে স্নায়ুর লড়াই জমে ওঠে। তবে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এগিয়ে যায় ফ্লিটউড। আর্সেনালের ব্রুনো গুইমারায়েসের শট ঠেকিয়ে দেন ফ্লিটউডের গোলরক্ষক জে লিচ। এই সেভ ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এরপর কোনর হৌঘি নিজের পেনাল্টি সফলভাবে জালে জড়িয়ে ফ্লিটউডের জয় নিশ্চিত করেন। টাইব্রেকারে ৫-৩ ব্যবধানে জিতে উৎসবে মেতে ওঠেন চতুর্থ সারির ক্লাবটির খেলোয়াড় ও সমর্থকেরা।
এই পরাজয় আর্সেনালের জন্য বড় হতাশার। একাদশে নয়টি পরিবর্তন, তরুণ খেলোয়াড়দের সুযোগ দেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ে জয়সূচক গোল করতে না পারা—সব মিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে গেল গানাররা। বিপরীতে, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াই করে ফ্লিটউড টাউন প্রমাণ করেছে, ফুটবলে কাগজে-কলমের শক্তির চেয়ে মাঠের পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্লিটউডের এই জয় শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়; ইংলিশ ফুটবলের বহুল আলোচিত ‘জায়ান্ট কিলিং’ বা বড় দলকে হারিয়ে দেওয়ার আরেকটি স্মরণীয় উদাহরণ হয়ে থাকল।
পড়ুন:মিরপুর টেস্টে টসে জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের
ইমি/


