নদীর পাড় ভাঙলে শুধু মাটি ভাঙে না, ভাঙে জনপদের স্বপ্ন। নেত্রকোনার মদন উপজেলার বাগজান গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সেই ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছিলেন। মগড়া নদীর করাল গ্রাসে গ্রামের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় যখন সবার কপালে চিন্তার ভাঁজ, তখন সরকারি প্রতিরক্ষা প্রকল্প তাদের মনে আশার আলো জ্বালিয়েছিল। সেই আশার প্রদীপ নিভতে সময় লাগেনি। অভিযোগ উঠেছে, তদারকির অভাব আর ঠিকাদারের স্বেচ্ছাচারিতায় নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ও ভেজা বালু দিয়ে দায়সারাভাবে শেষ করা হয়েছে স্কুল রক্ষার কাজ।
কাজের এমন বেহাল দশা আর গোপনীয়তার প্রতিবাদে বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে ফুঁসে ওঠেন স্থানীয়রা। প্রিয় বিদ্যাপীঠ প্রাঙ্গণেই জড়ো হয়ে মানববন্ধন করেন গ্রামের সর্বস্তরের মানুষ। তাদের কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ, আর চোখে ছিল শিশুদের ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন নিয়ে গভীর শঙ্কা।
বাগজান গ্রামের শিশুদের বর্ণমালা শেখার একমাত্র ভরসা এই প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। বছরের পর বছর ধরে মগড়া নদীর ভাঙন একটু একটু করে এগিয়ে আসছিল স্কুল ভবনের দিকে। অবশেষে সরকার যখন বিদ্যালয়টি রক্ষায় প্রতিরোধমূলক প্রকল্প হাতে নেয়, তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন অভিভাবক ও এলাকাবাসী। কিন্তু কাজ শুরু হতেই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। স্থানীয়দের অভিযোগ, যে কাজের ওপর বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব নির্ভর করছে, সেই কাজেই ব্যবহার করা হয়েছে অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী। এমনকি ভরাট ও প্রতিরক্ষার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে ভেজা বালু, যা নদীর স্রোতের মুখে টিকে থাকার মতো নয়।
মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফুল ইসলামের কণ্ঠে ঝরল সেই হতাশারই সুর। তিনি বলেন, ‘বিদ্যালয়টি রক্ষার খবরে আমরা খুশি হয়েছিলাম, ভেবেছিলাম আমাদের সন্তানদের স্কুলটা এবার বেঁচে যাবে। যেভাবে কাজ হচ্ছে, তাতে এই বাঁধ এক বর্ষাও টিকবে না। আমরা এমন অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত চাই।’
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, যে বিদ্যালয়টি রক্ষার জন্য এই বিশাল আয়োজন, সেই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বা পরিচালনা কমিটিকেও কাজের বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি। এলাকাবাসীর দাবি, সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে এবং কোনো ধরনের দৃশ্যমান তদারকি ছাড়াই ঠিকাদার নিজের মনমতো কাজ শেষ করেছেন।
সরকারি অর্থের এমন অপচয় মেনে নিতে পারছেন না গ্রামের সাধারণ মানুষ। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া আরেক বাসিন্দা সায়েম মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা আদৌ ঠিকমতো কাজ পরিদর্শন করেছেন কি না, তা নিয়ে আমাদের যথেষ্ট সন্দেহ আছে। সরকারের বরাদ্দের টাকা যদি সঠিকভাবে খরচ হতো, তবে সত্যিকার অর্থেই ভাঙন রোধ করা সম্ভব হতো।’
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া বক্তারা কেবল অভিযোগ করেই থামেননি, তাঁরা সুনির্দিষ্ট তিনটি দাবি তুলে ধরেছেন। তাহলো- প্রকল্পের কাজের মান নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা। প্রকল্পের মোট বরাদ্দ ও ব্যয়ের সঠিক হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা। এবং অনিয়মের সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা।
গ্রামবাসীর যৌক্তিক দাবি ও অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নেত্রকোনা জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ সাখাওয়াত হোসেন জানান, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। তিনি বলেন, ‘অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে চার সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হাতে পেলেই আমরা জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
তদন্ত কমিটির রিপোর্ট কবে আসবে আর কবেই বা ব্যবস্থা নেওয়া হবে- তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। তবে বাগজান গ্রামের মানুষের এখন প্রার্থনা, আগামী বর্ষায় মগড়া নদীর ঢেউ যেন ভেজা বালুর দুর্বল বাঁধ ভাসিয়ে নিয়ে তাদের সন্তানদের পাঠশালাটিকে গ্রাস করতে না পারে।
পড়ুন : মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের মেডিক্যাল পরীক্ষা শুরু ৩১ অক্টোবর
সা/


