রাজধানীর গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত মেট্রোরেল যোগাযোগ গড়ে তোলার লক্ষ্যে নেওয়া এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের অন্যতম অর্থায়নকারী দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) থেকে ঋণ পাওয়ার বিষয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও ঋণচুক্তির বিষয়ে এখন পর্যন্ত সাড়া মেলেনি। এ পরিস্থিতিতে সংকট সমাধানে দক্ষিণ কোরিয়া সফরে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, আগামী শনিবার অর্থমন্ত্রীর দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়ার কর্মসূচি রয়েছে। তিনি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জাপান সফরে রয়েছেন। জাপানে সরকারি সফর শেষে সিউলে গিয়ে কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে তাঁর। এসব বৈঠকে মেট্রোরেল প্রকল্পের ঋণ ছাড়াও বাজেট সহায়তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্পে দক্ষিণ কোরিয়ার ইডিসিএফের ১১০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার কথা। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৭ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ৩০০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা জানিয়েছে এবং ঋণচুক্তির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। বাকি ১৫ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইআরডি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এডিবির সঙ্গে সহঅর্থায়নকারী হিসেবে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়া আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। আলোচনার একপর্যায়ে ১১০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়। এ জন্য নিয়ম অনুযায়ী একটি কাঠামো চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল। সেই ভিত্তিতেই প্রকল্পটির অর্থায়ন পরিকল্পনা সাজানো হয়।
কোরিয়ার প্রস্তাবিত ঋণটি সহজ শর্তের। এর সুদের হার মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ১৫ বছরের রেয়াতকালসহ মোট ৪০ বছর সময় পাওয়ার কথা। এমন অনুকূল শর্তে ঋণটি পাওয়া গেলে প্রকল্পের অর্থায়ন ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা মিলবে।
তবে ঋণচুক্তির বিষয়ে কোরিয়ার পক্ষ থেকে সাড়া না পাওয়ায় প্রকল্পটির অর্থায়ন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ঋণচুক্তি সম্পন্ন না হলে প্রকল্পের পরবর্তী কার্যক্রম ও বাস্তবায়নের সময়সূচিতে প্রভাব পড়তে পারে।
ইআরডির এশিয়া উইংয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গত সোমবার সমকালকে জানান, ঋণচুক্তির বিষয়ে গত কয়েক মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার ইডিসিএফকে অন্তত চার দফা চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো চিঠিরই জবাব পাওয়া যায়নি।
ঢাকায় অবস্থিত ইডিসিএফের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে মিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রধান কার্যালয় থেকে কোনো নির্দেশনা বা জবাব না আসা পর্যন্ত তাদের পক্ষে এ বিষয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়।
এমন পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রীর দক্ষিণ কোরিয়া সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সফরে ঋণচুক্তির বিষয়ে অগ্রগতি অর্জনের পাশাপাশি বাংলাদেশের বাজেট সহায়তা পাওয়ার বিষয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া স্যামসাং ও এলজির মতো দক্ষিণ কোরিয়ার বড় কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন অর্থমন্ত্রী।
এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্পের নির্মাণকাজ ২০২৩ সালে শুরু হওয়ার কথা ছিল। এর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ হয় ২০২২ সালে। সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত প্রকৌশল নকশা তৈরিতে মোট ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, মৌলিক প্রকৌশল নকশা, দরপত্র, ভূমি অধিগ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন-সংক্রান্ত পরিকল্পনার কাজও শেষ হয়েছে।
তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রকল্পটির অনুমোদন আটকে যায়। পরবর্তী সময়ে ব্যয় কমিয়ে প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সাড়া না পাওয়ায় তা অনুমোদনের জন্য তোলা সম্ভব হয়নি।
প্রথমদিকে প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা। পরে একনেকে অনুমোদনের আগে ৭ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা কমিয়ে ব্যয় ৪৭ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত একনেক বৈঠকে প্রকল্পটি অনুমোদন পায়।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ) চালু হলে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত যাতায়াতে সময় লাগবে মাত্র ২৮ মিনিট। রুটটির দৈর্ঘ্য হবে ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে পাতালপথ এবং ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার উড়ালপথ।
এ রুটে মোট ১৫টি স্টেশন থাকবে। এর মধ্যে ১১টি পাতাল স্টেশন এবং চারটি উড়াল স্টেশন। গাবতলী থেকে শুরু হয়ে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজগেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও, আফতাবনগর, আফতাবনগর সেন্টার, আফতাবনগর পূর্ব ও নাছিরাবাদ হয়ে সর্বশেষ স্টেশন হবে দাশেরকান্দি।
প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিদিন এ রুটে প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন। প্রতিটি ট্রেনের যাত্রী ধারণক্ষমতা হবে ২ হাজার ৩১২ জন। এতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মধ্যে যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি সড়ক পরিবহনের ওপর চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর সড়কে গাড়ি চলাচল প্রায় ১ হাজার ৪৯টি কমতে পারে বলে প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে বছরে প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার টন কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের জুনে মেট্রোরেলটি যাত্রী চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে প্রকল্পের সামগ্রিক মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০৩২ সাল পর্যন্ত।
এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ) চালু হলে এটি মেট্রোরেল লাইন-৫ (উত্তর) ও লাইন-২-এর সঙ্গে সংযুক্ত হবে। এর মাধ্যমে রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে মেট্রোরেল যোগাযোগের বিস্তৃতি বাড়বে এবং ধীরে ধীরে পুরো ঢাকা শহরকে মেট্রোরেল অবকাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার ঋণচুক্তি। অর্থমন্ত্রীর আসন্ন সফরে এ বিষয়ে অগ্রগতি না হলে প্রকল্পের অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের সময়সূচি নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। ফলে সিউল সফরে ঋণ জটিলতা কাটানোর উদ্যোগ প্রকল্পটির ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পড়ুন:দেশের বাজারে সোনার দাম ঊর্ধ্বমুখী, ভরিতে বাড়ল ২,২১৬ টাকা
ইমি/


