মামলা আপস না করায় মোহনগঞ্জে নারীর বসতঘরে আগুন ও ভাঙচুর

চারদিকে পোড়া টিনের চালা, মাটিতে পড়ে আছে কয়লা হয়ে যাওয়া কাঠের স্তূপ আর ছাই। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার শুকদেবপুর গ্রামের একটি বসতবাড়ির আঙিনায় এখন কেবলই ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। ভিটেমাটি থাকলেও সেখানে ফেরার সাহস পাচ্ছেন না বাড়ির বাসিন্দারা। আদালতে চলমান মামলা আপস না করায় প্রতিপক্ষের দেওয়া আগুনে শুধু ঘরই পোড়েনি, কেড়ে নিয়েছে পুরো পরিবারের স্বাভাবিক জীবনের নিরাপত্তা। প্রাণভয়ে নিজের সাজানো সংসার ও বসতভিটা তালাবদ্ধ রেখে এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ভুক্তভোগী হেপি আক্তার ও তার পরিবারের সদস্যরা।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে সরেজমিনে শুকদেবপুর গ্রামে হেপি আক্তারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক সুনসান নীরবতা। মূল বসতঘরে ঝুলছে তালা, আর পাশেই পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া পুরোনো ঘরটির কঙ্কালসার টিনগুলো দাঁড়িয়ে আছে। বাড়িতে হেপি আক্তার কিংবা তার বৃদ্ধ বাবা লাল মিয়া- কাউকেই পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেশী আব্দুল বারেক জানান, অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই পরিবারটি চরম আতঙ্কে রয়েছে। রাতের আঁধারে ঘটনার পর থেকে তারা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন, বর্তমানে কোথায় আছেন তা প্রতিবেশীদের কেউ জানেন না।

এ ঘটনায় নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে এবং জড়িতদের বিচারের দাবিতে আজ (বৃহস্পতিবার) বিকেলে মোহনগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী হেপি আক্তার (৩৯)। তিনি শুকদেবপুর গ্রামের লাল মিয়ার মেয়ে এবং বিয়ের পর থেকে স্বামী কামাল মিয়াকে (৪১) নিয়ে বাবার বাড়িতেই বসবাস করে আসছেন।

থানায় দায়ের করা লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হেপি আক্তারের সাথে তার আপন মামাতো ভাই ও প্রতিবেশী কামাল হোসেনদের দীর্ঘদিন ধরে জমিজমাসহ পারিবারিক নানা বিষয় নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। হেপির দাবি, প্রতিপক্ষের লোকজন তার সকল সম্পত্তি জোরপূর্বক বেদখল করার উদ্দেশ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নানাভাবে অত্যাচার ও নিপীড়ন চালিয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২২ সেপ্টেম্বর হেপি আক্তারকে মারধর করে জখম করা হয়। ওই ঘটনায় কোনো উপায়ন্তর না দেখে পরদিন ২৩ সেপ্টেম্বর হেপির স্বামী কামাল মিয়া বাদী হয়ে মোহনগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন, যা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, আদালতে চলমান ওই মামলাটি আপসের মাধ্যমে তুলে নেওয়ার জন্য অভিযুক্তরা ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে আসছিল। এরই জেরে গত ২৫ অক্টোবর অভিযুক্তরা হেপি আক্তারের বাড়িতে গিয়ে মামলা তুলে না নিলে ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া এবং প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এই হুমকির মাত্র দুদিন পরই গত ২৭ অক্টোবর (মঙ্গলবার) দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে ঘটে সেই ভয়াবহ ঘটনা।

ভুক্তভোগী হেপি আক্তারের বর্ণনা অনুযায়ী, রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে একদল লোক তাদের বাড়িতে অনধিকার প্রবেশ করে। তারা প্রথমে মূল বসতঘরের দরজা-জানালায় এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে এবং পরে বাড়িতে থাকা পুরোনো বসতঘরটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। অস্ত্রের মুখে প্রাণভয়ে পরিবারের সদস্য কিংবা স্থানীয় প্রতিবেশীরা কেউই আগুন নেভাতে এগিয়ে আসার সাহস পাননি। আগুনে ঘরটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে প্রায় তিন লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। যাওয়ার সময় হামলাকারীরা অস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করে বলে যায়, দ্রুত মামলা তুলে না নিলে পরবর্তীতে পরিবারের সদস্যদের খুন করে লাশ গুম করে ফেলা হবে।

লিখিত অভিযোগে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলেন- শুকদেবপুর গ্রামের দুদু মিয়ার তিন ছেলে কামাল হোসেন (৪২), সেলোয়ার হোসেন (৪৫) ও মোফাজ্জল (৩৮), একই গ্রামের আনোয়ারের ছেলে ও তাদের ভাতিজা আলিম (২৬) এবং পার্শ্ববর্তী বারহাট্টা উপজেলার কান্দাপাড়া গ্রামের আসলামের ছেলে বিল্লাল হোসেন (৩৫)।

এছাড়াও অজ্ঞাতনামা আরও ছয় থেকে সাত জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগে ৫ নম্বর আসামি বিল্লাল হোসেনের হুকুমেই হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলে দাবি করেছেন প্রধান অভিযুক্ত কামাল হোসেন। নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‍“পুরো অভিযোগটাই মিথ্যা। আমরা আগুন দেওয়ার ঘটনার সাথে কোনোভাবেই জড়িত নই। মূলত প্রতিহিংসাবশত আমাদের ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে। হেপিদের সাথে আমাদের জমি নিয়ে সামান্য বিরোধ আছে, এর জেরে তারা আগেও আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মারধরের মামলা করেছে। তারা ভয়ে পলাতক নেই, বরং এক আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থান করছে।”

এ বিষয়ে মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুল ইসলাম হারুন জানান, ভুক্তভোগী নারীর পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুরো ঘটনাটি সরেজমিনে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : বোয়ালখালী ফুটবল একাডেমির কমিটি ঘোষণা

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন