নুন আনতে পান্তা ফুরায় যে সংসারে, সেই সংসারের মেয়েই আজ দেশের ক্রীড়াঙ্গনের শীর্ষে। সব বাধা-বিপত্তি ও চরম দারিদ্র্যকে জয় করে ৪০তম জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের নারী এককে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন মোংলার লিকা পোদ্দার।
২৯ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ ইনডোর স্টেডিয়ামে জাঁকজমকপূর্ণ ফাইনালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক চ্যাম্পিয়ন উর্মি আক্তারকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো সিনিয়র পর্যায়ে দেশ সেরার এই মুকুট মাথায় তুললেন তিনি। লিকার এই অভূতপূর্ব সাফল্যে এখন আনন্দের জোয়ার বইছে পুরো মোংলা জুড়ে। পাড়া-প্রতিবেশী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ তাকে ও তার পরিবারকে অভিনন্দন জানাতে ভিড় করছেন তাদের জীর্ণ কুটিরে।
লিকা পোদ্দারের জন্ম এক অতিদরিদ্র জেলে পরিবারে। বাবা পেশায় একজন প্রান্তিক মৎস্যজীবী। পশুর নদী আর সুন্দরবনের গহীনে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সাথে যুদ্ধ করে মাছ ধরাই তার কাজ। কোনোদিন জাল খালি ফিরলে উনুনে হাঁড়ি চড়ে না। ভাঙা চালার ঘর, বর্ষায় ছাদ চুইয়ে পড়া পানি, কোর্টে যাওয়ার মতো ভালো মানের জুতো বা ভালো মানের র্যাকেট কেনার টাকা না থাকা আর দুমুঠো ভাতের জন্য নিত্য সংগ্রাম—এই ছিল লিকার চেনা জগৎ। অভাবের কারণে যেখানে ঠিকমতো তিন বেলা খাবার জোটানোই দায়, সেখানে ব্যাডমিন্টনের মতো ব্যয়বহুল খেলায় দেশ সেরা হওয়ার স্বপ্ন দেখাটাই ছিল এক প্রকার বিলাসিতা।
কিন্তু দারিদ্র্য যার ইচ্ছাশক্তিকে দমাতে পারেনি, সেই লিকাই আজ দেখালেন কীভাবে অন্ধকারের বুক চিরে আলো ফোটাতে হয়। চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও নিজের মেধা, একাগ্রতা আর কঠোর পরিশ্রমকে পুঁজি করে তিনি ছিনিয়ে এনেছেন দেশের সর্বোচ্চ গৌরব।
মায়ের কথা বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন নতুন রানি
জাতীয় ব্যাডমিন্টনে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর অনুভূতি জানাতে গিয়ে নিজের মায়ের কষ্ট ও পরিবারের সংগ্রামের কথা মনে করে অশ্রু ধরে রাখতে পারেননি লিকা পোদ্দার। আবেগপ্লুত কণ্ঠে তিনি তার এই সাফল্যের কৃতিত্ব দেন পরিবারের অবিরত সমর্থন এবং বিশেষ করে বাবার কঠোর পরিশ্রমকে, যিনি শত কষ্টের মাঝেও মেয়ের স্বপ্নকে মরতে দেননি।
লিকার বাবা বলেন, “অনেক রাতে লিকা না খেয়েই অনুশীলনের ক্লান্তি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। ভাবতাম, আমি এক হতভাগা বাবা, যে মেয়ের মুখে ঠিকমতো খাবার তুলে দিতে পারি না, সে কীভাবে বড় কিছু করবে? আজ আমার বুকটা গর্বে ভরে গেছে। আমার লিকা আমাদের সব কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছে।”
উল্লাসে ভাসছে মোংলা
লিকা পোদ্দারের এই ঐতিহাসিক বিজয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই মোংলায় উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। স্থানীয় এলাকাবাসী ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন লিকাকে মোংলার গর্ব হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বইছে অভিনন্দনের ঝড়।
পল্টনের শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ ইনডোর স্টেডিয়ামে ইতিহাস গড়া মোংলার এই অদম অ্যাথলেটের পাশে দাঁড়াতে এবং তার পরবর্তী আন্তর্জাতিক লক্ষ্য পূরণে সরকারি ও বেসরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের জোর দাবি জানিয়েছেন দেশের ক্রীড়ামোদী ও এলাকাবাসী। লিকা প্রমাণ করেছেন, প্রতিকূলতা যত বড়ই হোক না কেন, স্বপ্ন দেখার সাহস আর তা বাস্তবায়নের দৃঢ় ইচ্ছা থাকলে যেকোনো সিংহাসন জয় করা সম্ভব।
পড়ুন : ১৪৪ ধারা জারি, কক্সবাজারের ইনানীতে হচ্ছেটা কী?


