গোলাপী জামা পরা ছোট্ট জান্নাতুল (৫) বিকেলের রোদে প্রতিবেশীর বাড়ির উঠানে খেলতে গিয়েছিল। কিন্তু সে আর জীবিত ফেরেনি। নিখোঁজের দুদিন পর বাড়ির পাশের ধানক্ষেতের আইলে যখন তাকে পাওয়া গেল, তখন তার কোমল শরীরের অর্ধেক মাংসই গায়েব; হাত-পা বিচ্ছিন্ন, পেট ও নাড়িভুঁড়ি শূন্য কঙ্কালসার দেহের গলা ও মুখে গোঁজা লাল গামছা। নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার কৈলাটি ইউনিয়নের হুগলী (জসিউড়া) গ্রামের রোমহর্ষক ও নৃশংস শিশু হত্যাকাণ্ডের প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও আজও উদ্ঘাটিত হয়নি প্রকৃত রহস্য। উল্টো জামিনে বেরিয়ে আসা আসামিদের প্রকাশ্য প্রাণনাশের হুমকিতে এখন চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে দিন কাটছে সন্তানহারা পরিবারটির।
রবিবার (১ নভেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টায় নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবে পরিবার ও এলাকাবাসীর ব্যানারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমন অসহায়ত্ব ও ন্যায়বিচারের আর্তি তুলে ধরেন নিহত জান্নাতুলের স্বজনরা।
সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়ে মা মোসা. ইয়াসমিন আক্তার এবং বাবা মো. আর্শাদ মিয়া বলেন, যে সন্তানকে তারা হারিয়েছেন তার খুনের বিচার তো মেলেইনি, এখন বাকি সন্তানদের জীবন বাঁচানোই দায় হয়ে পড়েছে।
মামলার এজাহার ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, হুগলী (জসিউড়া) গ্রামের বাসিন্দা মো. আর্শাদ মিয়ার পাঁচ বছর বয়সী কন্যা জান্নাতুল স্থানীয় ইশাতুল উলুম মহিলা মাদ্রাসার নূরানী বিভাগে পড়াশোনা করত। গত ৪ মে বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে মা-বাবার কাছে বলেই সে বাড়ির দক্ষিণ পাশে প্রতিবেশী হাবিল ও কাবিলদের বাড়িতে অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলতে যায়। এ সময় আর্শাদ মিয়া ও তার স্ত্রী বাড়ির উঠানে ধান তোলার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। বিকেল ৪টার দিকে কাজ শেষে আর্শাদ মিয়া স্থানীয় পাগলা বাজারে যান এবং তার স্ত্রী মেয়েকে খুঁজতে বের হন। কোথাও না পেয়ে মোবাইল ফোনে স্বামীকে জানালে তিনি দ্রুত বাড়ি ফিরে আত্মীয় স্বজনদের নিয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। কলমাকান্দা ফায়ার সার্ভিস ও ডুবুরি দলের সহায়তায় আশপাশের পুকুর ও ডোবায় তল্লাশি চালিয়েও শিশুটির কোনো হদিস মেলেনি। পরদিন ৫ মে কলমাকান্দা থানায় নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি করেন বাবা আর্শাদ মিয়া।
এরপর ৬ মে সকাল আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে প্রতিবেশী রুহুল আমিন ধান কাটতে গিয়ে কাবিলের বাড়ির পেছনে জনৈক জুলহাসের ধানক্ষেতের আইলে শিশুর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। খবর পেয়ে পুলিশ ও পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে জান্নাতুলের মরদেহ শনাক্ত করেন। সুরতহাল প্রতিবেদনের বর্ণনা অনুযায়ী, শিশুটির বাম হাতের কনুইয়ের নিচের অংশ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও নিখোঁজ ছিল। বাম হাতের বাকি অংশ, বুকের নিচ থেকে কোমর পর্যন্ত পেট ও নাড়িভুঁড়ি, বাম পায়ের গোড়ালির ওপরের অংশ এবং ডান পায়ের উরুতে কোনো মাংস ছিল না। বাম পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল এবং মুখের ভেতর ও গলায় লাল রঙের গামছা বাঁধা অবস্থায় মরদেহটি উদ্ধার করে নেত্রকোনা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় ওই দিনই (৬ মে) মো. আর্শাদ মিয়া বাদী হয়ে কলমাকান্দা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। এজাহারে পূর্ব হতে জমিজমা ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিবেশী মজিবুর রহমান (৪৫/৫০), শামসু মিয়া (৫২), কাবিল (২২) ও হাবিল (১৮)-কে সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নিহত জান্নাতুলের ফুফাতো ভাই মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, এত বড় একটি পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকৃত উদ্দেশ্য ও অপরাধীদের শনাক্তকরণ আজও সম্ভব হয়নি। মামলাটি বর্তমানে নেত্রকোনা জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের কাছে তদন্তাধীন থাকলেও পরিবারের কাছে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
নিহত শিশুর বাবা মো. আর্শাদ মিয়া তদন্ত প্রক্রিয়ায় গাফিলতির অভিযোগ তুলে বলেন, “হত্যাকাণ্ডের পর দুই মাস চলে গেলেও গুরুত্বপূর্ণ আলামতগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়নি, সেগুলো থানায় ফেলে রাখা হয়েছিল। পরে মামলাটি ডিবিতে স্থানান্তরিত হওয়ার আরও দুই মাস পর আলামতগুলো ঢাকায় ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়। চার-পাঁচজন মানুষ মিলে পরিকল্পিতভাবে আমার মেয়ের শরীরের মাংস কেটে আলাদা করেছে যাতে শারীরিক নির্যাতনের আলামত ও মূল রহস্য চাপা দেওয়া যায়। অথচ আজও আমরা মেয়ের শরীরের বাকি অংশটুকু কোথায় গেল বা কারা কীভাবে মারল, তার উত্তর পেলাম না।”
আর্শাদ মিয়া সংবাদ সম্মেলনে চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরে জানান, গত ৪ মে জান্নাতুল নিখোঁজ হওয়ার পর ৫ মে গ্রামের এক উঠান বৈঠকে অভিযুক্ত মজিবুর রহমান এলাকাবাসীর সামনে প্রকাশ্যে বলেছিলেন, পরদিন ধানক্ষেতে মেয়ের লাশ পাওয়া যাবে। ঠিক তার কথামতোই ৬ মে সকালে ধানক্ষেত থেকে লাশ উদ্ধার হয়। এছাড়াও দেড় বছর আগে রাত ২টার দিকে মজিবুর দা নিয়ে আর্শাদ মিয়ার ঘরে ঢুকে তাকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন এবং পরদিন নিজের ফেলে যাওয়া দা শনাক্ত করে নিয়ে গিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি।
মামলার ১ নম্বর আসামি মজিবুর রহমান ও ২ নম্বর আসামি সামছু মিয়াকে পুলিশ গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করলেও সম্প্রতি তারা জামিনে মুক্তি পান। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, মজিবুরের বিরুদ্ধে অতীতে শিশু অপহরণ, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও মাদক চোরাচালানসহ একাধিক মামলা রয়েছে। কিন্তু আদালতে সেসব তথ্য সুকৌশলে গোপন করে এবং মিথ্যা তথ্য দিয়ে তারা জামিন লাভ করেছেন।
জামিনে বেরিয়েই আসামিরা মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বাদী ও সাক্ষীদের ওপর বেপরোয়া চাপ সৃষ্টি করছেন। জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে গত ২৮ অক্টোবর কলমাকান্দা থানায় পরিবারের নিরাপত্তা বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করেছেন আর্শাদ মিয়া।
জিডি ও পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, সম্প্রতি রাত আনুমানিক ৭টার দিকে বাড়ির পাশের রাস্তায় আর্শাদ মিয়াকে একা পেয়ে মজিবুর ও সামছু মিয়া মামলা আপোষে প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন। রাজি না হওয়ায় তারা হুমকি দেন যে, মামলা না তুললে কিংবা সাক্ষীরা (বাদীর স্ত্রী ইয়াসমিন আক্তার ও প্রতিবেশী শিউলী আক্তারসহ অন্যরা) আদালতে সাক্ষ্য দিলে সুযোগ মতো বাদী, তার বাকি অবুঝ সন্তান ও সাক্ষীদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলা হবে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মা ইয়াসমিন আক্তার বলেন, “মজিবুর জামিনে ছুটে এসে এখনো থামেনি। সন্ধ্যার পর আমাদের বাড়ির সামনে এসে হুমকি দিয়ে বলে আমার স্বামীকে মেরে ফেলবে, আমরা যেন মামলা তুলে নিই। মেয়ের খুনিরা দ্রুত ধরা পড়ুক, সরকার যেন আমাদের সহযোগিতা করে।”
শিশুটির মামা সম্পর্কে আত্মীয় মো. মাহবুব বলেন, “বাচ্চাদের সাথে কারো শত্রুতা থাকে না, তবুও এত নৃশংসভাবে ভাগ্নিকে হত্যা করা হলো। আসামি জামিনে বেরিয়ে উল্টো পরিবারের সবাইকে রামদা দেখিয়ে ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে। আমরা চাই দ্রুত তাকে পুনরায় গ্রেফতার করে ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।”
হুমকির মুখে দিশেহারা বাবা আর্শাদ মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “হয় আমাদেরকে জেলে দিয়ে দেন, আর না হয় মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওদেরকে জেলে রাখেন।” তিনি ন্যায়বিচারের স্বার্থে বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং কলমাকান্দার কৃতী সন্তান ও জাতীয় সংসদের মাননীয় ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সংবাদ সম্মেলন থেকে পরিবারের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। তাহলো- জান্নাতুল হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটন এবং জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা। মামলার গুরুত্ব ও জটিলতা বিবেচনায় একটি বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষ, গভীর ও বিজ্ঞান ভিত্তিক তদন্তের ব্যবস্থা করা। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনসহ সব প্রাসঙ্গিক ফরেনসিক ও বৈজ্ঞানিক আলামত যথাযথভাবে পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করা। অতীতের অপরাধ গোপন করে জামিন পাওয়া ১ নম্বর আসামি মজিবুরের জামিন আদেশ পুনর্বিবেচনা করে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে পুলিশ হেফাজতে রাখা এবং বাদী ও সাক্ষীদের প্রাণনাশের হুমকির বিষয়ে তদন্তপূর্বক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মামলার তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বাদী পক্ষকে নিয়মিত অবহিত করা এবং দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের সদস্যরা স্পষ্ট করে বলেন, প্রমাণ ছাড়া কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে অপরাধী বানানো তাদের উদ্দেশ্য নয়; বরং পাঁচ বছরের নিষ্পাপ শিশুর পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের পেছনের সত্য উন্মোচন এবং জীবিতদের বাঁচার অধিকারটুকু নিশ্চিত করাই তাদের একমাত্র দাবি।
পড়ুন : এক মাসে ৩১ বিজিবির ১৪২ অভিযান: নেত্রকোনায় কোটি টাকার মাদক ও পণ্য জব্দ


