পেকুয়ায় এক যুগ পর দখলমুক্ত হচ্ছে শতবর্ষী ঐতিহ্যের খেলার মাঠ

একসময় মাঠজুড়ে ছিল ফুটবল-ক্রিকেটের উন্মাদনা। শিশু-কিশোরদের কলকাকলি আর খেলাধুলায় মুখর থাকত পুরো এলাকা। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনেও ছিল মাঠটির সরব উপস্থিতি। সময়ের পরিক্রমায় সেই চেনা দৃশ্য হারিয়ে যায়। দখল আর অবহেলায় সংকুচিত হয়ে পড়ে কক্সবাজারের পেকুয়ার শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী আলহাজ্ব কবির আহমদ চৌধুরী বাজারের খেলার মাঠ। দীর্ঘদিনের সেই অচলাবস্থা কাটিয়ে মাঠটি আবারও উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

বিজ্ঞাপন

উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় যুবদল নেতা কামরান জাদিদ মুকুটের উদ্যোগে মাঠটি দখলমুক্ত ও সংস্কারের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় স্থানীয় ক্রীড়ামোদী, শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে।

পেকুয়া বাজার ও ছালেহা কবির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন মাঠটি একসময় ছিল এলাকার ক্রীড়া ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। প্রায় এক শতাব্দী ধরে উন্মুক্ত থাকা মাঠে নিয়মিত ফুটবল ও ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতো। এমনকি বিভিন্ন সময়ে জানাজার নামাজের জন্যও মাঠটি ব্যবহার করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মাঠটির ৯৪ শতক জমি বিএস ৪৮৬ খতিয়ানের ৪৬৪৯ দাগে সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় তিন দশক আগে মাঠের বিভিন্ন অংশ দখল করে দোকান ও মার্কেট নির্মাণ করা হয়। এতে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ে মাঠের পরিসর। একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় নিয়মিত খেলাধুলা। ফলে বাজারের আশপাশের শিশু-কিশোর ও তরুণেরা হারিয়ে ফেলে উন্মুক্ত মাঠে খেলাধুলার সুযোগ।

দীর্ঘদিনের এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করে মাঠটির হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেন পেকুয়া উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক কামরান জাদিদ মুকুট। তাঁর লিখিত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপ নেয় উপজেলা প্রশাসন। গত কয়েক দিন ধরে মাঠটি সংস্কার ও খেলাধুলার উপযোগী করার কার্যক্রমও চলছে।

সর্বশেষ রোববার (১ নভেম্বর) বিকেলে মাঠটি পরিদর্শন করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ আনিসুল ইসলাম, পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী হাসান, যুবদল নেতা কামরান জাদিদ মুকুট এবং স্থানীয় সাংবাদিকেরা। এ সময় মাঠের জমির মালিকানা, সীমানা ও দখলসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

পরিদর্শনকালে মাঠের কিছু অংশের দখল নিয়ে আপত্তি ও বাধার মুখে পড়তে হয় সংশ্লিষ্টদের। বিএনপি নেতা সরওয়ার আলমসহ কয়েকজনকে তাঁদের দখলে থাকা জমির বৈধ কাগজপত্র নিয়ে হাজির হতে বলা হয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট দোকান ও মার্কেটের বৈধ কাগজপত্র থাকলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উপজেলা ভূমি অফিসে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ছালেহা কবির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য এমরান জাদিদ বলেন, “একটি খেলার মাঠ শুধু খেলাধুলার জায়গা নয়, এটি শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি গড়ে তোলারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। দীর্ঘদিন মাঠটি ব্যবহার করতে না পারায় নতুন প্রজন্ম খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আমরা চাই, সরকারি জমির সঠিক সীমানা নির্ধারণ করে মাঠটি দখলমুক্ত করা হোক এবং সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হোক। প্রশাসনের এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থী ও তরুণদের পাশাপাশি পুরো এলাকার মানুষ উপকৃত হবে।”

মাঠটির ঐতিহ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জমিদার পরিবারের সদস্য ফরহাদ চৌধুরী বলেন, “আমাদের দাদা কবির আহমদ চৌধুরীর স্মৃতিবিজড়িত পেকুয়া বাজারের এই ঐতিহ্যবাহী মাঠটি ফিরে পাওয়ার উদ্যোগ দেখে আমরা আশাবাদী। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারি খাসজমি যাঁরা দখলে রেখেছেন, তাঁদের প্রতি অনুরোধ—সরকারি নির্দেশনা মেনে মাঠটি উন্মুক্ত করার কাজে সহযোগিতা করুন।”

পেকুয়া উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক কামরান জাদিদ মুকুট বলেন, “পেকুয়া বাজারের এই ঐতিহ্যবাহী মাঠটি দীর্ঘ ১৮ থেকে ৩০ বছর ধরে কার্যত পরিত্যক্ত ছিল। চারপাশের বিভিন্ন অংশ দখল হয়ে যাওয়ায় মাঠটি খেলাধুলার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বাজারের আশপাশে উন্মুক্ত খেলার মাঠের সংকট রয়েছে। ফলে শিশু-কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলার সুযোগ সীমিত হয়ে গেছে। জনস্বার্থে মাঠটির হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে আমরা প্রশাসনের সহযোগিতায় কাজ করছি। মাঠটি সবার জন্য উন্মুক্ত ও খেলাধুলার উপযোগী করাই আমাদের লক্ষ্য।”

পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী হাসান বলেন, “মাঠটি সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জমি বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। জমির দখলসংক্রান্ত বিষয়টি যাচাই করে উপজেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে মাঠটি দখলমুক্ত ও উন্মুক্ত করার কার্যক্রম চলছে।”

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ আনিসুল ইসলাম বলেন, “মাঠটি দীর্ঘদিন ধরে খেলাধুলার অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে। এটিকে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করার লক্ষ্যে আমরা পরিদর্শন করেছি। জমির দখলসংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বৈধ কাগজপত্র থাকলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভূমি অফিসে জমা দিতে বলা হয়েছে। কাগজপত্র যাচাই করে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা চাই, মাঠটি আবারও সবার খেলাধুলার উপযোগী হয়ে উঠুক।”

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের উদ্যোগে মাঠটির সঠিক সীমানা নির্ধারণ, দখলসংক্রান্ত জটিলতার নিষ্পত্তি এবং সংস্কারকাজ দ্রুত সম্পন্ন হবে। ফিরে আসবে হারিয়ে যাওয়া খেলাধুলার পরিবেশ। নতুন প্রজন্ম পাবে মুক্তভাবে বেড়ে ওঠার একটি উন্মুক্ত পরিসর। আর দখল-অবহেলার আড়াল থেকে বেরিয়ে আবারও প্রাণ ফিরে পাবে পেকুয়ার শতবর্ষী ঐতিহ্যের এই মাঠ। এক যুগ পর দখলমুক্ত হচ্ছে শতবর্ষী ঐতিহ্যের খেলার মাঠ।

পড়ুন : কারখানার উৎপাদন অব্যাহত রাখা ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন