কেন্দুয়ায় রাতের আঁধারে বিলে বিষ, পথে বসার উপক্রম ১৫ চাষির

ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে তিল তিল করে গড়ে তোলা হয়েছিল মাছের খামার। স্বপ্ন ছিল, মাছ বিক্রি করে ফিরবে পরিবারের সচ্ছলতা, শোধ হবে মহাজনের দেনা। কিন্তু একটি রাতের ব্যবধানেই বিষের ছোবলে নীল হয়ে গেছে সেই স্বপ্ন। নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার মোজাফরপুর ইউনিয়নের হারুলিয়া গ্রামের ‘গিলান্দর বিলে’ কে বা কারা রাতের আঁধারে বিষ প্রয়োগ করেছে। গত তিন দিন ধরে বিলের পানিতে মরে ভেসে উঠছে লাখ লাখ টাকার মাছ। এতে প্রায় ১২ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন ভুক্তভোগী মৎস্যচাষিরা।

সোমবার (২ নভেম্বর) সরেজমিনে গিলান্দর বিলে গিয়ে দেখা যায় হৃদয় বিদারক দৃশ্য। বিস্তীর্ণ জলাশয়ের চারপাশে পচা মাছের তীব্র দুর্গন্ধ। পানির ওপর সাদা হয়ে ভেসে আছে পুঁটি, ভেদা, টেংরা ও টাকিসহ দেশীয় প্রজাতির অসংখ্য মরা মাছ। শুধু ছোট মাছই নয়, বিষের তীব্রতায় কার্প, বোয়াল, শোল ও গজারের মতো বড় মাছগুলোও মরে পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। বিলের পানিতে ও পাড়ে ভাসতে দেখা গেছে কীটনাশকের খোলা প্যাকেট। যা স্পষ্ট ধারণা করা যায়, পরিকল্পিতভাবেই নিধনযজ্ঞ চালানো হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় পাঁচ একর আয়তনের গিলান্দর বিলটি হারুলিয়া গ্রামবাসী দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখল করে আসছেন। প্রতি বছর উন্মুক্ত ডাকের মাধ্যমে মাছ চাষের জন্য লিজ দেওয়া হয়। চলতি বছর সর্বোচ্চ দুই লাখ ৫৫ হাজার টাকায় বিলটি লিজ নেন স্থানীয় বাসিন্দা আবু কাইয়ুম ভূইয়া। এর পাশাপাশি ৭২ হাজার টাকায় আরও একটি ডোবা লিজ নেন তিনি। একা এত বড় বিনিয়োগের ঝুঁকি না নিয়ে গ্রামের আরও ১৫ জনকে সাথে নিয়ে অংশীদারিত্ব বা শেয়ার গড়ে তোলেন তিনি। একজন পাহারাদার নিয়োগ করে দিনরাত নিবিড় পরিচর্যায় মাছগুলো যখন বিক্রির উপযোগী হয়ে উঠছিল, ঠিক তখনই নেমে আসে বিপর্যয়।

ঘটনার সূত্রপাত গত ২৯ অক্টোবর সন্ধ্যায়। বিলের দায়িত্বে থাকা পাহারাদার হায়দার আলী জানান, ওই দিন সন্ধ্যায় তিনি বিলপাড়ে ইদ্রিস মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখেন। এরপর ৩০ অক্টোবর সকাল থেকেই বিলের পানিতে মাছ মরে ভেসে উঠতে শুরু করে। দিন যত গড়িয়েছে, মরা মাছের পরিমাণ ততই বেড়েছে।

হঠাৎ এমন সর্বনাশে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বিলের ১৫ জন অংশীদার। তারা জানান, বিভিন্ন জায়গা থেকে ঋণ ও ধারদেনা করে তারা বিলে পুঁজি খাটিয়েছিলেন। আশা ছিল, মৌসুম শেষে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করবেন। শত্রুতাবশত স্থানীয় কুচক্রী একটি মহল তাদের সেই সাজানো স্বপ্ন মুহূর্তেই ধ্বংস করে দিয়েছে। এখন কীভাবে ঋণের টাকা পরিশোধ করবেন, তা ভেবেই কূল পাচ্ছেন না তারা।

প্রধান ইজারাদার আবু কাইয়ুম ভূইয়া আক্ষেপ করে জানান, তিলে তিলে গড়া তাদের পুরো বিনিয়োগ এখন পানির নিচে পচছে। এ ঘটনায় তারা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বিষয়টি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে অবহিত করার পাশাপাশি গ্রামবাসীর সাথে আলোচনা করে দ্রুতই থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করবেন বলে তিনি জানান।

এ বিষয়ে কেন্দুয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা খাদিজা খাতুনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, গিলান্দর বিলে বিষ প্রয়োগে মাছ নিধনের বিষয়টি তিনি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত নন। তবে এ ধরনের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সর্বপ্রথম থানায় লিখিত অভিযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।

অন্যদিকে, কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানান, হারুলিয়া গ্রামের বিলে মাছ মরে যাওয়ার বিষয়টি তিনি লোকমুখে শুনেছেন। তবে এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিলের পানিতে ভেসে ওঠা মরা মাছের দিকে তাকিয়ে এখন কেবলই দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন হারুলিয়া গ্রামের ১৫টি পরিবারের সদস্যরা। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : ৪৪তমে যোগ দেননি, ৪৫তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডার হলেন অমিত খান

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন